রাজনীতি

‘আমাকে ও আমার পরিবারকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে’


নিজস্ব প্রতিবেদক:আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘১৫ আগস্টে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করেও প্রতিক্রিয়াশীলরা ক্ষান্ত হয়নি। আমাকে ও আমার পরিবারকে বারবার হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে। ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সমাবেশে গ্রেনেড হামলা চালানো হয় আমাকে এবং আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের হত্যার জন্য। এমনকি আমেরিকাতে আমার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে অপহরণ করে হত্যার ষড়যন্ত্র করা হয়।’
তিনি বলেন, ‘জিয়াউর রহমানের সঙ্গে ১৫ আগস্টের খুনিদের যোগাযোগ ছিল, তা এখন দিবালোকের মতো স্পষ্ট। আর তার স্ত্রী খালেদা জিয়াও ক্ষমতায় এসে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা চালায়। এর সঙ্গে তার ছেলে তারেক রহমান জড়িত ছিল।’

শুক্রবার সকালে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহতদের স্মরণে রাজধানীর বঙ্গবন্ধু এভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ আয়োজিত আলোচনা সভায় ভিডিও কনফারেন্সে অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। প্রধানমন্ত্রী তার সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সে যুক্ত হন।

২০০৪ সালের ২১ আগস্ট সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে সমাবেশ করার প্রেক্ষাপট তুলে ধরে আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘তখন বিএনপি জামায়াত জোট সরকার ছিল। তাদের পক্ষ থেকে দেশব্যাপী সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চলছিল। এই ধরনের গ্রেনেড হামলা বোধহয় পৃথিবীতে আর কোথাও ঘটেনি। সাধারণত রণক্ষেত্রে কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে এই ধরনের ঘটনা ঘটে। কিন্তু আমাদের সেই র‌্যালিতে আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং আমাকে হত্যার উদ্দেশ্য নিয়েই এই ঘটনাটা ঘটিয়েছিল। ভাগ্যক্রমে আমি বেঁচে গিয়েছি। কিন্তু সেইদিন আইভী রহমানসহ আমাদের ২২ জন নেতা-কর্মী শাহাদাৎবরণ করেছেন। সেই সঙ্গে অনেক নেতা-কর্মীরা আহত হয়েছেন, অনেকে আহত হয়ে পরে মারা গেছেন।’

তিনি বলেন, ‘১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছিল। সেই হত্যাকাণ্ড শুধু রাষ্ট্রপতিকে নয়, একটি পরিবার এবং সেই সঙ্গে আমাদের পরিবারের অন্যান্য সদস্য, তাদেরও নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। ৩ নভেম্বর ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে জাতীয় চার নেতাকে হত্যা করে। এরপর আমাদের আওয়ামী লীগের অসংখ্য নেতা-কর্মীকে গ্রেফতার এবং নির্যাতনের শিকার হতে হয়। কত লাশ যে আমাদের টানতে হয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এই হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে হত্যা ও ক্যু-ষড়যন্ত্রের যে রাজনীতি শুরু হয়েছিল, তার বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, মানুষের ভাগ্য পরিবতর্ন এবং মানুষের উন্নয়নের জন্য কাজ করে যাচ্ছি আমরা। ২১ বছর পর সরকারে এসেছিলাম। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পরেই এদেশের মানুষ প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রের স্বাদ পেয়েছিল এবং সরকার যে জনগণের জন্য কাজ করে সেটা উপলব্ধি করতে পেরেছিল সবাই এবং জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত হয়েছিল। ২০০১ সালে এক গভীর চক্রান্ত করে আমাদের ক্ষমতায় আসতে দেয় নাই তারা। আমরা যে ভোট পাইনি তা নয়। কিন্তু সেখানে একটা বিরাট ষড়যন্ত্র ছিল। আর তারপরে ২০০৪ সালে এই হত্যাকাণ্ড ঘটাবার চেষ্টা। এটা কেন?’

শেখ হাসিনা আরো বলেন, ‘আমি আমাদের নেতাকর্মীদের এবং দেশবাসীকে স্মরণ করাতে চাই, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীদের ইনডেমনিটি দেয়া হয়, বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেয়া হয়। ওই চক্রান্তের সঙ্গে খন্দকার মোশতাক যেমন জড়িত, সেই সঙ্গে জিয়াউর রহমান গংরাও জড়িত। বঙ্গবন্ধুর হত্যাকারীরা, যারা জাতির পিতাকে হত্যা করেছে, একটা পরিবারকে হত্যা করেছে, রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস করেছে, তাদের বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দেয়া হয়, পুরস্কৃত করা হয় এবং তাদের সঙ্গে জিয়াউর রহমানের ঘনিষ্ঠতা ছিল। সেটা তো খুনি কর্নেল রশিদ ফারুক বিবিসির ইন্টারভিউতে খুব স্পষ্টভাবে বলেছে। জিয়াউর রহমানের সঙ্গে খুনিদের যে সম্পর্ক ছিল এটা তো আজ দিবালোকের মতো স্পষ্ট।’

তিনি বলেন, ‘তার স্ত্রী খালেদা জিয়া ক্ষমতায় আসে। ক্ষমতায় এসেই ২১ গ্রেনেড হামলা ঘটায় এবং এর সঙ্গে তার ছেলে তারেক রহমান জড়িত। সেটা তো যারা এই ষড়যন্ত্রে জড়িত তাদের কথাতেই বের হয়ে এসেছে।’

আওয়ামী লীগ সভাপতি আরো বলেন, ‘এক একটা ঘটনা ঘটাবার আগে খালেদা জিয়া যেসব বক্তৃতা দিয়েছে, কোটালীপাড়ায় বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল, তার আগে বলেছিল আওয়ামী লীগ একশ’ বছরেরও ক্ষমতায় আসতে পারবে না। আবার ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পূর্বে খালেদা জিয়ার বক্তৃতা ছিল শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী তো দূরের কথা, বিরোধী দলের নেতাও কোনোদিন হতে পারবে না। এই ভবিষ্যৎবাণী খালেদা জিয়া কীভাবে দিয়েছিল? কারণ তাদের চক্রান্তই ছিল আমাকে তারা হত্যা করে ফেলবে। তাহলে তো আমি আর কিছুই হতে পারবো না। এটাই তাদের চক্রান্ত ছিল। এখানেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। আপনারা জানেন, আমেরিকায় আমার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে কিডন্যাপ করে হত্যার পরিকল্পনা করেছিল। সেটা ধরা পড়েছে, আমেরিকায় এফবিআই তাদের তদন্তে জানিয়েছে।’

২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার ঘটনার কথা স্মরণ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘সবচেয়ে দুভার্গ্য, বিএনপি সরকার যদি এর সঙ্গে জড়িত নাই থাকবে তাহলে তারা আলামতগুলো কেন নষ্ট করলো? ওই গ্রেনেড হামলার পরেই তখনকার সিটি কর্পোরেশেনের মেয়র তার লোকজন নিয়ে এসে পুরো এলাকা ধুয়ে ফেলে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০০৪ সালে তৎকালীন সরকারের মদদেই ২১ আগস্ট ভয়াবহ গ্রেনেড হামলা হয়েছিল। সেদিন আহতদের সাহায্য করার বদলে লাঠিচার্জ, টিয়ারগ্যাস নিক্ষেপ করা হয়েছিল। কেন সেদিন তারা এটা করেছিল? এত বড় একটা ঘটনা, অথচ সে সময় সংসদে আমাদের কথা বলতে দেয়া হয়নি। তখন পার্লামেন্টের সংসদ নেতা খালেদা জিয়া বলে দিল ওনাকে আবার কে মারবে। তখন তো বলতেই হয় যে আপনিই তো মারবেন। চেষ্টা করেছেন ব্যর্থ হয়েছেন সেজন্য আর পারছেন না।’

বঙ্গবন্ধুকন্যা বলেন, ‘২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলার মতোই বহুবার বিভিন্ন হামলার শিকার হয়েছি আমি। কিন্তু এরকম ভয়াবহ হামলার পরেও বেঁচে আছি। নিশ্চিয়ই আল্লাহ রেখে দিয়েছেন কিছু কাজ সেটা সম্পন্ন হওয়া পর্যন্ত হয়তো কাজ করে যেতে পারবো। আল্লাহ সেই সুযোগ দেবেন। আমি সেটুকুই চাই, সেই কাজটুকু করে যাবো। জাতির পিতার স্বপ্নের সোনার বাংলা হিসেবে গড়ে তুলবো।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘যখন গ্রেনেড হামলাটা হলো, সাধারণ একটা সভ্য দেশ হলে কী করতো? সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ এবং অন্যান্য সবাই ছুটে আসতো আহতদের সাহায্য করতে, উদ্ধার করতে, চিকিৎসা দিতে। বঙ্গবন্ধু মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ। সেখানে কোনো রোগী যেতে পারে নাই। চিকিৎসা নিতে পারে নাই। ঢাকা মেডিকেল কলেজে বিএনপির সে সমস্ত ডাক্তার তারা কেউ সেখানে উপস্থিত ছিলেন না। যাদের ডিউটি ছিল, তারাও ছিল না, কারণ তারা আহতদের চিকিৎসা করবেন না। আমাদের যারা ডাক্তার ছিল তারা ছুটে গিয়েছিল, তারা সেখানে চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন।’

তিনি বলেন, ‘ঢাকা শহরে কত হাসপাতাল কত ক্লিনিক আছে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলার পর সেটা জানতে পারি। সমগ্র ঢাকা শহর ছড়িয়ে ছিল আমাদের নেতা-কর্মী। মিছিলে যারা দূরে ছিল তারা তখন ছুটে আসেন এবং যারা বেঁচে যায় তাদের হাসপাতালে নিতে যান তখন পুলিশ লাঠিচার্জ করলো। এসব করা হয়েছিল যাতে সেদিন ওই হামলাকারীরা নির্বিঘ্নে ওই জায়গা ত্যাগ করতে পারে, সেই সুযোগটা সৃষ্টি করার জন্য। কাজেই সরকারের মদদ না থাকলে ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলা হতে পারতো না। সন্ত্রাসীদের এক জায়গায় করা, তাদের ট্রেনিং দেয়া ও পরবর্তীতে তাদের বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার সুযোগ করে দেয়া হয়। তাদের ধারণা ছিল আমি মারা গেছি। যখন শুনলো মারা যাইনি, ওই রাতের বেলায় চার জনকে দেশ থেকে পালাবার সুযোগ করে দেয়া হয়। আসলে খুন-খারাবি তাদের অভ্যাস। এরা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করে না, মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাস করে না।’

ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়কে যুক্তরাষ্ট্রে কিডন্যাপ করে হত্যার চেষ্টার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘এফবিআই যখন এটা তদন্ত করে সেখানে বিএনপি নেতা দোষী সাব্যস্ত হয় এবং সাজাপ্রাপ্ত হয়। ওইখানে বিএনপি নেতা মাহবুবুর রহমান এবং শফিক রেহমানের নাম বেরিয়ে এসেছে। যে শাস্তি পায় সে যে তারেক জিয়ার সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করে এই ঘটনা ঘটিয়েছিল, এটা আমরা কখনো জানতে পারতাম না যদি এফবিআই এটা খুঁজে বের না করতো।’

সভায় স্বাগত বক্তব্য রাখেন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ প্রান্তে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

Tags

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
You cannot copy content of this page
Close
Close