এ কেমন ‘লকডাউন’

প্রকাশিত: ৮:০০ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ৮, ২০২১

এ কেমন ‘লকডাউন’

সায়ন্থ সাখাওয়াৎ:
হাসপাতালে সিট নেই। আইসিইউর জন্য হাহাকার। একটু অক্সিজেনের জন্য হাসপাতাল থেকে হাসপাতালে ছোটাছুটি। ছুটতে ছুটতে অ্যাম্বুলেন্সেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল কত প্রাণ!

কেন এই করুণ অবস্থা? এখনো কি কোরাস পার্টি বলতেই থাকবে, হঠাৎ আসা করোনা সময় দেয়নি প্রস্তুতি নেওয়ার? তাহলে গত এক বছর সরকার করলটা কী?

যদিও গত ৬ এপ্রিল করোনায় মৃত্যু ও শনাক্তে আগের সব রেকর্ড ভেঙেছে।

কিন্তু সরকারি হিসাবে সে সংখ্যা মৃত্যু ৬৬ ও শনাক্ত ৭ হাজার ২১৩ দাঁড়িয়েছে। এই ৬৬ ও ৭ হাজার নিয়েই যদি এক বছর সময় পাওয়ার পরেও মানুষ অক্সিজেনের অভাবে রাস্তায় মারা যায়, আইসিইউর অভাবে মারা যায়, তবে আমাদের অর্জনটা কী?

পৃথিবীর আর কোন দেশ আছে যেখানে দিনে ৬৬ জনের মৃত্যু ও ৭ হাজার শনাক্ত হওয়ার মতো অবস্থায় মানুষ বিনে চিকিৎসায় মরছে?

আমরা যেখানে এই সংখ্যা নিয়েই হাল ছেড়ে দেওয়ার মতো অবস্থায় চলে এসেছি, সেখানে যেসব দেশে এর চেয়ে বহুগুণ বেশি মৃত্যু ও শনাক্ত হচ্ছে রোজ, তারা সামাল দিচ্ছে কী করে? মহামারীতে অনেক সময় মৃত্যু অবধারিত হয়ে ওঠে।

তাই বলে বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু? যে রাষ্ট্রে বিনা চিকিৎসায় মানুষের মৃত্যু হয়, সে রাষ্ট্র পরিচালকরা কি তার দায় এড়াতে পারে?

এ ক্ষেত্রেও হয়তো কোরাস পার্টি বলবে, করোনা কমে আসায় সরকার বাড়তি ব্যবস্থা নেয়নি। আবার বেড়ে যাওয়ায় এই করুণ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। কিন্তু করোনার প্রকোপ যেকোনো সময় আবার বাড়তে পারে, সেটা তো বিশ্বব্যাপীই আলোচনা হচ্ছিল।

সেকেন্ড ওয়েভ বা দ্বিতীয় ধাক্কাটা যে প্রথমটার চেয়ে আরও ভয়াবহ হতে পারে সে আশঙ্কাও তো বিশেষজ্ঞরা করছিলেন।

স্প্যানিশ ফ্লুর সময়ও সেকেন্ড ওয়েভে মৃত্যুর সংখ্যা প্রথমটার তুলনায় যে অনেক বেশি ছিল সে উদাহরণও আমাদের সামনে আছে। তারপরও আমাদের সরকার উদ্যোগী হয়নি। কারণ তাদের কাছে মানুষের জীবন গুরুত্বহীন।

তাদের কাছে একমাত্র গুরুত্বপূর্ণ হলো যেকোনো পন্থায় রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা।

আমাদের রোগীরা হাসপাতালে সিট পায় না। অক্সিজেন পায় না। কিন্তু গত এক বছর সরকার এ বিষয়ে কী করল? যেসব হাসপাতালে করোনা রোগী ভর্তি হচ্ছে সেসব হাসপাতালও সরবরাহকারী কর্তৃপক্ষ থেকে প্রয়োজনমতো অক্সিজেন পাচ্ছে না। ফলে তাদেরও ভর্তি করা রোগীকে অক্সিজেন দিতে হিমশিম খেতে হচ্ছে।

সেখানেও সরকারের ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত নাজুক। আমাদের আইসিইউর অভাব। অথচ গত বছরই দেশে ভেন্টিলেটর তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে উদ্যোগ আজও আলোর মুখ দেখেনি।

দেখবে কী করে? সেজন্য সরকারের যে পরিকল্পনা ও পৃষ্ঠপোষকতা থাকতে হয় তা তো এ দেশে নেই। অথচ সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে পাশের দেশ ভারত ও পাকিস্তান ভেন্টিলেটর তৈরিতে অনেক এগিয়ে গেছে। দৈনিক ভোরের কাগজে প্রকাশিত (৪ এপ্রিল ২০২১) এ-সংক্রান্ত একটি রিপোর্টে লেখা হয়, ২০২০ সালের শুরুতে বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারী দেখা দেওয়ার পর জরুরিভাবে কৃত্রিম শ্বাসযন্ত্র বা ভেন্টিলেটর মেশিন তৈরিতে উঠেপড়ে লাগে বিভিন্ন দেশ। এ প্রচেষ্টায় গত এক বছরে অনেক দেশই সফল হয়েছে।

ভারত এখন প্রতি মাসে দেড় হাজার ও পাকিস্তান ৩০০ ভেন্টিলেটর তৈরি করছে। তাদের হাসপাতালগুলোয় সেসব যন্ত্র ব্যবহার হচ্ছে। অথচ সফলতার দ্বারপ্রান্তে এসেও ভেন্টিলেটর তৈরি করতে পারেনি বাংলাদেশ।

সরকারের সঠিক পৃষ্ঠপোষকতা না পাওয়া ও আমলাতান্ত্রিক জটিলতার কারণে এমন অবস্থা হয়েছে বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের।

অন্যদিকে, করোনা প্রতিরোধ ব্যবস্থাপনায়ও সরকারের অবস্থা হ-য-ব-র-ল। ‘লকডাউন’ নিয়েও চলছে এক ধরনের তামাশা। এটা ঠিক লকডাউন নাকি ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ সেটা নিয়ে খোদ সরকারের মধ্যেই দ্বিধা আছে।

সেই ‘লকডাউন’ও মানুষ মানছে না। লকডাউনের প্রতিবাদে সাধারণ মানুষ রাস্তায় নামছে। সহিংস হচ্ছে। ভাঙচুর করছে। আবার লকডাউন মানতে প্রশাসনের লোকজন সাধারণ মানুষকে বাধ্য করতে গেলে সেখানেও হচ্ছে সংঘাত। ক্ষুব্ধ মানুষ থানায় আক্রমণ করছে। সরকারি কর্মকর্তাদের গাড়ি পুড়িয়ে দিচ্ছে।

সরকারের সিদ্ধান্তহীনতা ও অব্যবস্থাপনা যে কতটা ভয়াবহ তা দেশ রূপান্তরের কয়েকটা সংবাদ শিরোনাম দেখলেই স্পষ্ট হয়ে যায় ‘বিধিনিষেধে স্ববিরোধিতা দুর্ভোগে সাধারণ মানুষ’, ‘অফিস খোলা, বাস বন্ধ বেশি ভাড়ায় পকেট ফাঁকা’, ‘সেরামই ভরসা, বিকল্প টিকা অনিশ্চিত’, (০৬ এপ্রিল ২০২১) ।

৭ এপ্রিল দেশ রূপান্তর-এ প্রকাশিত রিপোর্টই বলছে, করোনার বিস্তার রোধে সরকারের দেওয়া লকডাউন বা বিধিনিষেধ অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ‘অকার্যকর বিধিনিষেধ দ্বিধায় সরকার’ রিপোর্টটিতে লেখা হয়, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ মোকাবিলায় সরকারের দেওয়া প্রথম পদক্ষেপই ব্যর্থ হওয়ার পথে।

‘লকডাউন’ নাকি ‘কঠোর বিধিনিষেধ’, কী করা যাবে কী করা যাবে না, এই নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই ১১ দফা নির্দেশনা একেবারেই ভেঙে পড়েছে দ্বিতীয় দিন গত মঙ্গলবার। গত সোমবার থেকে এক সপ্তাহের জন্য ১১ দফা কঠোর বিধিনিষেধ জারি করে প্রজ্ঞাপন দেয় সরকার। তাতে বলা হয়, সীমিত আকারে অফিস-আদালত চলবে এবং হোটেল-রেস্তোরাঁ খোলা থাকবে, তবে বসে কেউ খেতে পারবে না।

অফিস খোলা রাখার সিদ্ধান্ত থাকলেও আর দূরপাল্লার পরিবহন ও সব ধরনের পরিবহন বন্ধ রাখা হয়। শপিংমল, দোকানপাট বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত থাকলেও বইমেলা খোলা রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়। ফলে কঠোর বিধিনিষেধ নিয়েই বিভ্রান্তি দেখা দেয়।

পরিবহন সংকট ও অধিক ভাড়া গুণে অফিসগামী মানুষের ক্ষোভের মুখে সরকারের লকডাউনের দ্বিতীয় দিন ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ ১১ সিটি করপোরেশন এলাকায় গণপরিবহন চলাচলের সিদ্ধান্ত জানানো হয়। অন্যদিকে ব্যবসায়ীরা বইমেলার উদাহরণ দিয়ে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছে।

একই রিপোর্ট থেকে জানা যায়, স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক বলেছেন, প্রতিদিন যদি ৪-৫ হাজার রোগী বাড়ে তাহলে সারা শহরকে হাসপাতাল বানালেও সামাল দেওয়া সম্ভব না।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান বলেছেন, লকডাউন বলি আর যাই বলি এই ১১ দফার বিষয়ে সিরিয়াস হতে হবে। এখনই হাসপাতালে জায়গা নেই, রোগী আরও বাড়লে চিকিৎসাসেবা দেওয়াও অসম্ভব হয়ে পড়বে।

যেখানে সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীরা পর্যন্ত মনে করছেন এভাবে করোনার প্রকোপ বাড়তে থাকলে তাদের পক্ষে সামাল দেওয়া সম্ভব নয়, তাহলে তারা করোনা প্রতিরোধে আরও আগে কেন ব্যবস্থা নেননি?

অনেকেরই অভিযোগ, করোনা পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে জেনেও সরকার লকডাউন বা চলাচলে বিধিনিষেধের দিকে আরও আগে না গিয়ে তারা ব্যস্ত ছিল দশ দিনব্যাপী স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্যাপনে।

সেটা করতে গিয়ে সরকারি সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ দমনে। ঠিক এক বছর আগেও এমনই হয়েছিল। সেসময়ও সরকার অমনোযোগী ছিল করোনা নিয়ন্ত্রণে। তার ফলে দ্রুত করোনা ছড়িয়ে পড়েছিল।

সামনে রোজা। তারপরই ঈদ। ব্যবসায়ীদের ঈদকে কেন্দ্র করে যে বিনিয়োগ ও প্রস্তুতি তা আরও আগেই নেওয়া হয়ে গেছে, সে অবস্থায় সরকার তাদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা ছাড়াই হঠাৎ লকডাউন ঘোষণা করে দিল। তাদের ক্ষতিপূরণ কী করে হবে, অসহায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবন কী করে চলবে সে বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনাও দেয়নি সরকার।

‘দিন আনি দিন খাই’ জনগোষ্ঠীর জন্য সরকারের কী ধরনের আর্থিক সহায়তা আছে তাও জানে না তারা। ফলে এভাবে হঠাৎ করে লকডাউন ডেকে দিলেই যে মানুষ তা মানবে না, এটাই তো স্বাভাবিক। সাধারণ মানুষ যে লকডাউন মানছে না তার দায় কোনোভাবেই ওইসব মানুষের না।

সরকার যদি ব্যস্ত থাকে যেকোনো উপায়ে ক্ষমতায় থাকার ফন্দি বের করতে আর লুটপাটে, সে ক্ষেত্রে যা হওয়ার তাই হচ্ছে দেশে। পরিকল্পনাহীন কোনো কিছুই টেকসই হয় না। দেশের মানুষকেই যদি বাঁচাতে না পারে, তবে ক্ষমতায় থেকেও যে শুধুই ঘৃণিত হবে, সে বোধটাও হয়তো হারিয়ে ফেলেছে ক্ষমতাসীনরা।

-লেখক চিকিৎসক ও কলামিস্ট

ফেসবুকে আমরা

পুরাতন সব সংবাদ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
এই মাত্র পাওয়া