কোয়ার্টার

প্রকাশিত: ৩:০২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৬, ২০২১

কোয়ার্টার

 

নওরীন জোয়ার্দার

কি একটা স্বপ্ন দেখে অত্যন্ত বিরক্তি নিয়ে ঘুম ভাংলো আফফানের। ঘুম থেকে উঠতেই সেই চিরচেনা হৈ-চৈ শুরু হয়ে গেলো। এটা যেন আমাদের বাঙ্গালীদের ঘরের রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে এই যুগে।

আফফানের মা মিসেস দিনা ঝাঁঝালো গলাতে চিৎকার শুরু করলেন, “বেলা ১২ টা না বাজলে নবাবজাদার ঘুম ভাংগে না। আফফান হা করে তাকিয়ে আছে তাঁর মায়ের দিকে। আচমকা ঘড়িতে তাকিয়ে দেখল সবে মাত্র ৯ তা বেজেছে। আজহার সাহেব আফফানের বাবা। হঠাৎ ওনার বদলি হয়েছে চট্রগ্রামে। সেখানেই সরকারি কোয়ার্টারে পরিবার সহ উঠবেন। আফফান এর এই বিষয়ে কোন মাথা ব্যাথা নেই। গত দুই দিন ধরে তাঁর মা বাসার মালামাল গোছগাছে ব্যস্ত।

আফফান দশম শ্রেণির ছাত্র। খুব দস্যি টাইপের ছেলে। সারাদিন এ-দিক ও-দিক ঘুরে বেড়ানোটাই তাঁর কাজ। ঘরের কোন কাজে তাঁর বিন্দু মাত্র আগ্রহ নেই। অবশেষে খুবি তাড়াহুড়ার মধ্যে বাসা বদল করা হয়ে গেলো তাদের। খুবি ছিমছাম জায়গা, গাছপালা বেশি নেই। জানালা দিয়ে তাকালেই চোখে পড়ে পাহাড় কেটে কত সুন্দর করে রাস্তা তৈরি করা হয়েছে।

চট্রগ্রাম থেকে বেশ অনেকটা ভিতর দিকে বাসাটি। বাসা ও তাঁর চার পাশের পরিবেশ বেস উপভোগ করা শুরু করল আফফান। স্কুল শেষ করে প্রায় বিকালে কোয়ার্টার ঘুরে বেড়াত। একদিন মাগরিবের আযান এর সময় হয়ে গেছে প্রায় ঠিক এমন সময় আফফান কোয়ার্টারের একটা পরিত্যাক্ত অংশে ছোট একটা ছেলেকে দেখে আনমনে কি যেন বলে চলেছে। আর কোন খোঁজ না নিয়ে মা এর বকা ও পিটুনী খাওয়ার ভয়ে তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে যায় আফফান। সন্ধ্যায় পড়াশোনা করে রাতের খাবার শেষ করে ঘুমাতে চলে যায়। তখন প্রায় ১১ টা বাজে। হালকা ঘুম আসতেই সে স্বপ্নে দেখে সেই ছোট্র ছেলেটা তাকে ইশারায় ডাকছে, আর বলছে তুমি যাবে আমার সাথে? আচমকা ঘুম ভেংগে উঠে যায় আফফান। চোখ আটকে যায় তাঁর জানালার বাহিরে। দেখে ছোট্র ছেলেটা আফফান কে ডাকছে আর বলছে, তোমাকে আমি কিছু দেখাব। প্লিজ তুমি আমার সাথে চলো। প্রথম দিকে আফফান অনেক টা ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁরপরেও কি যেন মনে করে তাঁর সাথে চলে গেলো। এত রাতে এই ছোট্র ছেলে কোথা হতে আসলে বা কিভাবে আসল তা ঠাহর করতে পারছিল না। চলার পথে আফফান ছেলে টিকে নানা রকমের প্রশ্ন করে গেলো কিন্তু ছেলেটা একদম কোন ভ্রুক্ষেপ করছিল না। আপন মনে সম্মুখ পানে ছুটে যাচ্ছিল। হটাৎ একটা ভাঙ্গা বাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়ে গেলো। আর ফিসফিস করে বলল আফফান ভাইয়া! এই ভবন টা দেখুন। আফফান তাঁর দিকে তাকিয়ে আছে। হটাৎ সে চোখে ঝাপসা দেখতে শুরু করল, কেমন যেন একটা ঘোরের ভিতর হারিয়ে গেলো সে। যখন ঘোর কাটল তখন সে তাঁর পাশে আর সেই বাচ্চা কে দেখতে পেলো না। বাচ্চা কে না পেয়ে একরম চিন্তায় পড়ে গেলো। আস্তে আস্তে ভবনের দিকে এগিয়ে গেলো। সেখানে গান বাজনার আওয়াজ শুনতে পেলো কিন্তু সেখানে কোন মানুষকে খুজে পেলো না। তিন চারটা রুম ঘুরে কিছু না পেয়ে বাড়ির দিকে ফিরে এলো। এসে চুপি চুপি শুয়ে পড়ল। তাঁর মা বাবা কেউ টের পেলো না।

ঘুম থেকে উঠতে উঠতে সকাল ১০ টা বেজে গেলো। আজ শুক্রবার স্কুল ছুটি সে কারণের ঘুমের কোন চিন্তা নেই। ঘুম থেকে ফ্রেশ হয়ে নিলো। এরপর নাস্তা করে তাঁর বন্ধু রফিককে ফোন দিলো। রফিককে বাসায় আসতে বলল। বাসায় এলে ছাদে গিয়ে তারা এই বিষয় নিয়ে আলোচনা করল। তারা দুই বন্ধু মিলে সিদ্ধান্ত নিলো আজ এই বিষয়ের সমাধান করবে।

বিকাল বেলা দুজন হাটতে হাটতে ভবনের দিকে চলে গেলো। তাঁরা দিনের আলো থাকতে থাকতেই ভবনের কাছে চলে গেলো। আসার আগে আফফান তাঁর মাকে বলে এসেছে আজ রাতে রফিকের বাসায় থাকবে। রফিকের বাবা মা ছেলের এই এডভেন্সার মূলক কাজ করতে সাহায্য করেন। আর আফফানের বাবা মা রফিকের মা বাবা কে চিনে না। আর রফিকের মা বাবা এডভেন্সার প্রিয় মানুষ হওয়ার কারণে এই খবর তাঁর মা বাবাকে বলবে না এজন্য তাদের কোন চিন্তা নেই।

তারা এদিক ওদিক ঘোরা ঘুরি করে কিন্তু কিছু খুঁজে পেলো না। পরিত্যক্ত বাড়ি। ঘরের ভিতর ময়লার স্তুপ। দেখেই বুঝা যাচ্ছে এখানে মোঘল আমলে লোকজন থাকত। এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে মাগরিবের আযান দিয়ে দিলো। আঁধার ঘনিয়ে এলো। তারা হাটতে হাটতে পরিত্যাক্ত ফুল বাগানের দিকে এগিয়ে গেলো। সেখানে দেখে একটা অপরূপা সুন্দরী নারী বসে আছে। কত সুন্দর কাজল টানা চোখ। দেখতে খুবই মায়াবী।

আফফান ও রফিক আস্তে আস্তে গিয়ে মেয়েটির পাশে বসল এবং জিজ্ঞেসা করল আপা আপনি এই সন্ধ্যা বেলাতে বাগানে কেন? মেয়েটা তাদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিলো। আর বলতে শুরু করল তাহলে শুনো, বহুত বছর আগের কথা। এটা সুন্দর একটা গ্রাম ছিল। নাম ছিল মুক্তাপুর। সেখানে একটা দস্যি মেয়ে ছিল নাম ছিল তাঁর মুক্তা। তারা দুই ভাই বোন ছিল মুক্তা আর শান্ত। সারাদিন মুক্তা গ্রামের এই প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়াত। শান্ত মুক্তার জন্য বেলি ফুলের মালা গেঁথে দিত। সেটা মাথায় দিত মুক্তা। চারদিকে বেলি ফুলে গন্ধে মৌ মৌ করত। এলাকায় একটা জমিদার ছিল। হটাৎ একদিন শিকারে বেরিয়ে মুক্তা তাঁর নজরে পড়ে গেলো। সে মেয়েটি কে নিয়ে যেতে চাইল। মেয়ের ভাইকে হত্যা করে মেয়েটিকে জোর করে তাদের বালা খানায় নিয়ে আসে।

বালাখানায় এনে মেয়েটিকে তাদের মনরঞ্জন এর জন্য ব্যবহার করতে থাকে। রাতের বেলা মদ খেয়ে ঝাপিয়ে পড়ত মেয়েটির উপর। মেয়েটির আত্ম চিৎকার এই চার দেওয়াল ছাড়া আর কেউ কোন দিন শুনতে পাই নাই। তারা দিনে দিনে মেয়েটির উপর নির্যাতন বাড়িয়ে দিচ্ছিল। নির্যাতনের মাত্রা আর সহ্য করতে না পেরে একদিন তাদের বিষ পাণ করিয়ে হত্যা করে ফেলে। তারপর মুক্তাও আত্মহত্যা করে। এত গল্প শুনে আফফান ও রফিক শিউরে উঠে।

রফিক জিগাসা করে আচ্ছা আপু এই ঘটনার সাথে আপনার সম্পর্ক কি? তখন মেয়েটি বলে, সেই মুক্তা নামক মেয়েটি হচ্ছে আমি। আর গতকাল যে ছেলেটি কে দেখেছিলে সে আমার ভাই। আচ্ছা তোমরা আমার একটা উপকার করো তাহলে আমার সুখ হবে। তারা সমস্বরে বলে উঠল কী আপু? শুনো ভাইয়া! আমি তোমাদের অনেক বিশ্বাস করলাম। তবে শুনো, এই ঘরের মাঝখানে কিছু সোনা দানা আছে। সেগুলো তুলে কোয়ার্টারের দক্ষিনে মহিদুল নামে একজনের বাড়ি আছে সে আমার বড় বোনের নাতী। খুব কষ্টে আছে। না খেয়ে থাকে। তুমি এই গুলো তাকে দিয়ে আসিও। আর এই বিষয় কাউকে বলবে না কেমন! এই বলেই হটাৎ করে মেয়েটা উধাও হয়ে যায়। মেয়েটা চলে যাওয়ার পরে তারা বাসায় ফিরে আসে। এসে দেখে রাত ১১ টা বেজে গেছে।

খাওয়া দাওয়া করে সব কিছু রফিকের মা কে খুলে বলে। রফিকের মা কাজটা করতে বলে। ঠিক সেই ঘরের মেঝে খুড়ে কিছু সোনা পায় সেগুলো নিয়ে মহিদুল সাহেবকে দিয়ে আসে। মহিদুল সাহেব এত সোনা পেয়ে খুব খুশি হন। তাদেরকে ধন্যবাদ দেন। পরে মুক্তা এদের দুজনকেউ উপহার দেন।

লেখকঃ কবি, সাহিত্যিক

ফেসবুকে আমরা

পুরাতন সব সংবাদ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
এই মাত্র পাওয়া