তালেবান সমস্যা: পরাশক্তিগুলোর আদর্শিক দ্বন্দ্বের বাইপ্রডাক্ট

প্রকাশিত: ৭:২৮ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ৭, ২০২১

তালেবান সমস্যা: পরাশক্তিগুলোর আদর্শিক দ্বন্দ্বের বাইপ্রডাক্ট

 

লেখক: মুছা কালিমুল্লাহ:
আফগানিস্তানের তালেবান সমস্যা এবং এর ভিতরের প্রকৃত রাজনীতি সম্পর্কে জানতে হলে আমাদের কিছুটা হলেও পিছে ফিরে তাকাতে হবে। রাজনীতি নিয়ে সরব ব্যক্তিমাত্রই ওয়াকিফহাল বিংশ শতাব্দীর বিশ্বরাজনীতিতে দুটি প্রধান রাজনৈতিক মতাদর্শের উত্থান এবং স্নায়ু যুদ্ধের প্রেক্ষাপট সম্পর্কে।

একটু পেছন ফিরে তাকালে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব পরশক্তি হওয়ার পথে এগিয়ে যেতে থাকে আর এই পরাশক্তি হওয়ার পথে অনেকাংশে এগিয়ে যায় ১৯১৮ সালে প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন কর্তৃক ১৪ দফা প্রণয়নের মাধ্যমে “লীগ অব নেশনস” প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বিশ্ব রাজনীতির চালকের অবস্থানে অধিষ্ঠিত হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তির পরাজয় এবং বৃহৎ অর্থনীতির দেশ হয়েও সর্বনিম্ন ক্ষতির সম্মুখীন হওয়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তৎকালীন বিশ্বে অর্থনৈতিক, সামরিক এবং রাজনৈতিকভাবে প্রধান বিশ্ব পরাশক্তিতে রূপান্তরিত হয়েছিল।

অন্যদিকে বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে ১৯১৭ সালে বলশেভিক বিপ্লবের মাধ্যমে রাশিয়ার যার তন্ত্রের পতন এবং সাম্যবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ইউনিয়ন অফ সোভিয়েত সোশালিস্ট রিপাবলিকস (ইউ এস এস আর) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নতুন রাজনৈতিক মতাদর্শের পথচলা শুরু হয়। পরবর্তী সময়ে প্রায় তিন দশকের জোসেফ স্ট্যালিন এর যোগ্য নেতৃত্বে ইউএসএসআর তৎকালীন বিশ্বের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে নতুন পরাশক্তি রূপে নিজেদেরকে জানান দেয়। যদিও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন মিত্রপক্ষের ছিল কিন্তু তাদের এই মৈত্রী বিশ্বযুদ্ধের পরে বেশিদিন টিকে থাকিনি।

কারণ তাদের মাঝে রাজনৈতিক মতাদর্শগত সম্পূর্ণ বিপরীত ভাবধারা বিদ্যমান ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়ন সমাজতান্ত্রিক দেশ হওয়ার কারণে তাদের প্রধান লক্ষ্য ছিল সারা পৃথিবীব্যাপী সমাজতন্ত্রের বীর্য বপন করার বিপরীত পক্ষে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান লক্ষ্য ছিল বিশ্বব্যাপী গণতন্ত্র তথা পুঁজিবাদের প্রসার ঘটানো। আর এই জায়গাটি ছিল তৎকালীন বিশ্বের দুই পরাশক্তির দন্দের মূল কারণ।

১৯৪৫ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রথম পারমাণবিক বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়ে নিজেদেরকে সামরিক দিক থেকে অনেক বেশী শক্তিশালী করে তোলে এবং পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে থাকে বিপরীত দিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন পূর্ব ইউরোপের দেশগুলোতে ক্রমবর্দ্ধমান নিজের মতাদর্শ প্রচার করতে থাকে। পূর্ব ইউরোপে সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্রমবর্দ্ধমান মতাদর্শ প্রচার ঠেকানোর জন্য ১৯৪৯ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ দেশ কে সাথে নিয়ে “ন্যাটো” সামরিক জোট গঠন করে। আর যে কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে একটি মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ শুরু হয়। যেটা ইতিহাসে স্নায়ুযুদ্ধ বা “cold war” বা প্রক্সি যুদ্ধনামে পরিচিত। স্নায়ু যুদ্ধের কারনে সারা বিশ্ব দুইটি ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। আর এই স্নায়ুযুদ্ধের ফলে পুঁজিবাদ বনাম সমাজতন্ত্রের নামে বিশ্বের এই দুইটি ভাগে ভাগ হওয়াকে বলা হয় ‘Bipolarity’ বা দ্বিমেরুকরন। সময়টা আশির দশক। তখন স্থানভুক্ত দূরপ্রাচ্যর সব দেশগুলো সোভিয়েত ইউনিয়নের আওতাভুক্ত ছিল একমাত্র আফগানিস্তান ছাড়া।

সোভিয়েত গোয়েন্দা সংস্থা কেজিবি মারফত সোভিয়েত সরকারকে জানানো হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানের মাটি ব্যবহার করে সোভিয়েত ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত এলাকাতে হামলা করতে পারে।

সোভিয়েত সরকার কালবিলম্ব না করে ১৯৭৯ সালে আফগানিস্তান দখলের উদ্দেশ্যে সামরিক অভিযান শুরু করে। কিন্তু আফগানিস্তানের সাধারণ জনগণ সোভিয়েত ইউনিয়নের এই আগ্রাসন মোটেও ভালোভাবে নেয়নি। তারা কোনভাবেই সোভিয়েতদের কাছে স্বাধীনতা হারাতে চাননি এইজন্য তাঁরা সমগ্র আফগানিস্থান জুড়ে বিচ্ছিন্নভাবে শত্রু বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে থাকে। সোভিয়েত আগ্রাসনের বিরুদ্ধে লড়ে যাওয়া এই যুবকদেরকে যুক্তরাষ্ট্র স্বাধীনতাকামী মুজাহিদীন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। যুক্তরাষ্ট্র এবং সৌদি আরব তাদেরকে পরোক্ষভাবে অস্ত্র এবং অর্থ দিয়ে সাহায্য করছিল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঘনিষ্ঠ মিত্র পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী পশতুন অঞ্চলে চলত এই সমস্ত মুজাহিদদের প্রশিক্ষণ এবং পৃষ্ঠপোষকতা যারা পরবর্তীতে তালিবান নামে আত্মপ্রকাশ করে। পরবর্তীতে এই কথা যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা সম্পূর্ণরূপে স্বীকার করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান উদ্দেশ্য ছিল প্রতিদ্বন্দ্বী সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের অগ্রযাত্রা প্রতিরোধ করা এবং তারা সেখানে সফলও হয়েছিল। ১৯৮৯ সালে সোভিয়েত সরকার আফগানিস্তান থেকে সেনা প্রত্যাহার করতে বাধ্য হয়। কিন্তু আফগানিস্তানের আভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব চলতে থাকে যার জের ধরে ১৯৯৬ সালে তালেবান আফগানিস্তানের রাজধানী দখল করার মাধ্যমে আফগানিস্তানের শাসন ক্ষমতায় আসে।

যার প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতায় এবং মূলে ছিল যুক্তরাষ্ট্র। ঘটনা চলতে থাকে কিন্তু তালেবান শাসন আমলে তালেবান যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান ভাবাদর্শ গণতন্ত্রে আঘাত হানে। গণতন্ত্রের অনেকগুলো বিধান অস্বীকার করে নারীদের অধিকারকে সীমিত করে নিয়ে আসে যার মাধ্যমে শুরু হয় তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র বৈরী সম্পর্ক। আর এই সম্পর্ক চরম তিক্ততার পর্যায়ে চলে আসে ২০০১ সালে নাইন-ইলেভেন হামলার মাধ্যমে।

এই ন্যাক্কারজনক হামলার জন্য তৎকালীন মার্কিন প্রশাসন জঙ্গিগোষ্ঠী আল-কায়েদা প্রধান ওসামা বিন লাদেনকে দায়ী করে। তখন ওসামা বিন লাদেন আফগানিস্তানে অবস্থান করছিলেন এবং আফগানিস্তানে আল-কায়েদার প্রধান ঘাঁটি ছিল। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র লাদেনকে তাদের হাতে তুলে দেয়ার কথা বলে তালেবান প্রশাসনকে কিন্তু তালেবান তা অস্বীকার করেন। তখন থেকে তালেবান-যুক্তরাষ্ট্র দ্বন্দ্ব চরম পর্যায়ে পৌঁছায়। যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তানে সামরিক অভিযান শুরু করে এবং মাত্র কয়েকদিনের ভিতরে তালেবানকে ক্ষমতাচ্যুত করে। এরপর ২০০৪ সালে এক প্রত্যক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে আফগানিস্তানে গণতন্ত্রপন্থী যুক্তরাষ্ট্র ঘরনার সরকার নিয়োগ পায়।

যুক্তরাষ্ট্র জঙ্গিবাদ দমনের কথা বলে আফগানিস্থানে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ন্যাটো বাহিনীর সৈন্য সমবেত রাখে তখন থেকে তালেবানরা বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন সময় সৈন্যদের উপরে বিভিন্নভাবে আত্মঘাতী হামলা করে টিকে ছিল। বিস্ময়করভাবে না বরং Bipolarity’ বা দ্বিমেরুকরনের অংশ হিসেবে আফগানিস্তানে মার্কিন নেতৃত্বাধীন সরকার ক্ষমতায় থাকার পুরো সময় তালেবানকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পুরনো শত্রু রাশিয়া এবং একুশ শতকের প্রথম দিকে ধীরে ধীরে বিশ্ব পরাশক্তির পথে হাঁটতে থাকা চীন আন্তর্জাতিক ভু- রাজনীতিতে নিজেদের প্রভাব বিস্তার এবং যুক্তরাষ্ট্রের প্রভাব খর্ব করার জন্য তালেবানকে অর্থনৈতিক এবং সামরিক ভাবে সাহায্য করে আসছিল।

অন্যদিকে উপমহাদেশের সামরিক দিক থেকে বিশ্বের অন্যতম পরাশক্তি পাকিস্তানের অবস্থান প্যারাডক্স এর মত। প্রথমত পাকিস্তান তার ভূমি ব্যবহার করতে দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে ন্যাটো বাহিনীর সাপ্লাই দেয়ার মাধ্যমে তালিবান বিরোধী পদক্ষেপে যুক্তরাষ্ট্রকে সাহায্য করেছিল অন্যদিকে স্পষ্টত অভিযোগ আছে পাকিস্তানের গোয়েন্দা সংস্থা তালেবানের অন্যতম প্রধান ভরসার জায়গা। এটা সম্ভবত এ কারণে একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখা অন্যদিকে চিরশত্রু ভারতকে চাপের মুখে রাখা। কারণ ১৯৯৯ সালে তালেবান কর্তৃক ভারতের বিমান ছিনতাই ভারতীয় ইতিহাসে এক কলঙ্কজনক অধ্যায়। যার ফলে ভারত তিনজন প্রধান জঙ্গি নেতা কে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছিল। পরবর্তীতে তাদেরই একজন জইশ-ই-মোহাম্মদের প্রতিষ্ঠা করেন।

২০০৮ সালে মুম্বাই হামলার সাথে জড়িত ছিল লস্করে তাইয়্যেবার জঙ্গিরা পরবর্তীতে খবর পাওয়া যায় পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার মদদে এ হামলা হয়েছিল। আর এই সকল জঙ্গি সংগঠনের সাথে তালেবানের ওতপ্রোত সম্পর্ক। স্বভাবতই এই সমস্ত ঘটনা পাকিস্তানের জন্য হাততালির ব্যাপারও বটে এবং ভারতীয় সামরিক বাহিনীর ব্যর্থতার কাহিনী।যদিও পাকিস্তান বরাবরই তাদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করে আসছে। দু্ই দশকের এক রক্তাক্ত যুদ্ধের পর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন চলতি বছরের ১১ই সেপ্টেম্বরের মধ্যে আফগানিস্তান থেকে তাদের সর্বশেষ সেনা প্রত্যাহারের প্রস্তুতি নিচ্ছে তখন বিষয়টা রাশিয়া এবং চীনের জন্য হাততালি প্রধান কারণ হিসেবে দাঁড়িয়েছে কারণ আফগানিস্তান থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে তারা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আফগানিস্থানে পতন হিসেবে দেখছেন। তালেবানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সরাসরি আলোচনা শুরু হয়েছিল ২০১৮ সালে।

২০২০ সালের ফেব্রুয়ারীতে কাতারের রাজধানী দোহায় দুই পক্ষের মধ্যে যে শান্তি চুক্তি হয়, তার শর্ত ছিল যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে তাদের সৈন্য প্রত্যাহার করবে এবং তালেবানও আর মার্কিন বাহিনীর ওপর কোন হামলা চালাবে না। চুক্তির আরও শর্তের মধ্যে ছিল তালেবান আর আল কায়েদা কিংবা অন্য কোন জঙ্গী সংগঠনকে তাদের নিয়ন্ত্রিত এলাকায় আশ্রয় দেবে না এবং আফগান শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাবে।

পক্ষে-বিপক্ষে চুক্তির অনেক শর্ত লঙ্ঘনের পর সর্বশেষ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহার শুরু করার মাত্র কয়েকদিনের ভিতরে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার খরচ করে সাজানো আফগানিস্তানের সৈন্যবাহিনীকে নাকানি-চুবানি দিয়ে নাস্তানাবুদ করে সমগ্র আফগানিস্তান দখল করে নেয় তালেবান।

এখনো পর্যন্ত সমস্ত কর্মের ভিত্তিতে প্রতীয়মান হচ্ছে যে, রাশিয়া-চীন-পাকিস্তান জোট তালেবানের কৌশলগত মিত্রতে পরিণত হয়েছে। সুতরাং আফগানিস্তানে তালেবান এর উত্থান, আফগানিস্তানে সাধারণ মানুষদের মানবেতর জীবনযাপন, এত এত মৃত্যু, অর্থনৈতিক দুর্যোগ, মানবাধিকারের লঙ্ঘন এবং সর্বোপরি প্রাকৃতিক সম্পদ এবং সৌন্দর্য্যে ভরপুর আফগানিস্তানের খারাপ অবস্থার জন্য প্রধানত Bipolarity’ বা দ্বিমেরুকরনের রাজনীতিই দায়ী।

শিক্ষার্থী, আইন বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

ফেসবুকে আমরা

পুরাতন সব সংবাদ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
 
১০
১১১২১৩১৪১৫১৬১৭
১৮১৯২০২১২২২৩২৪
২৫২৬২৭২৮২৯৩০  
এই মাত্র পাওয়া