শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে তারুণ্যের ভাবনা

প্রকাশিত: ৮:৪৫ অপরাহ্ণ , ডিসেম্বর ১৪, ২০২০

অশ্রু, শোক আর রক্তের স্রোত পেরিয়ে বাঙালির ইতিহাসে ডিসেম্বর উল্লাসিতভাবে চূড়ান্ত বিজয়ের মাস হিসেবে গ্রন্থিভুত হতে পারত। কিন্তু সকল সাফল্য, গৌরব, উজ্জ্বলতা, অহংকার আর প্রশংসার মাঝেও একটি অপ্রসন্ন অধ্যায় রচয়িত হয়েছে গুটিকয়েক নরপশু তুল্য দেশীয় মানুষের সহায়তায়।

একটি নবীন দেশের মূল্যবান অঙ্গগুলো ছিন্ন করে যুগ যুগ কালের অগ্রগতি পিছিয়ে দিয়েছে তাঁরা। নবগঠিত স্বাধীন দেশকে নিয়ে শহীদ বুদ্ধিজীবীদের পরিকল্পনা কিংবা রূপরেখা সম্পর্কে এখনকার তরুণ সমাজ কতটা অবগত? ডিসেম্বরের হর্ষ-বিষাদের সংমিশ্রণ তরুণদের কতটা অনুপ্রাণিত করে?

এসব নিয়েই কয়েকজন তরুণের ভাবনা তুলে ধরেছেন হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়(হাবিপ্রবি)-এর শিক্ষার্থী- মো. হাবিবুর রহমান মুন্না

‘বুদ্ধিজীবীদের মেরেও বাঙালিকে দমাতে পারেনি’

পাকবাহিনী পরাজয় সুনিশ্চিত বুঝতে পেরে ইতিহাসের জঘণ্যতম নীলনকশা করে বাংলার সূর্যসন্তানদের নিশ্চিহ্ন করে বাঙালি জাতিকে শত বছর পিছিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হয়। দেশ স্বাধীন হলেও এই সূর্যসন্তানদের হারানোর ক্ষতি সত্যিই অপূরণীয়।

সময়ের সঙ্গে ক্ষত কিছুটা শুকালেও দাগ রয়েছে আজও। সেদিনের পিছিয়ে পড়া এখনও অসম্পূর্ণ করে রেখেছে জাতির বিকাশকে।

দেশ এগিয়ে যাচ্ছে, নতুন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে কিন্তু তাঁরা বেঁচে থাকলে, তাঁদের সঠিক নির্দেশনায় আরও আগেই জাতি এগিয়ে যেত। তথাপি, সেদিনের জঘণ্যতম হত্যাযজ্ঞ হয়ত জাতিকে পিছিয়ে দিয়েছে, কিন্তু রুদ্ধ করতে পারেনি; সময় লাগলেও বাঙালি দমে যায়নি।

নতুন সময়ে তারুণ্যের নতুন সম্ভাবনায় দেশ ও জাতি আরো এগিয়ে যাবে এই প্রত্যয় ব্যক্ত করি। বাংলার মহান সন্তানদের হারানোর শোককে শক্তিতে রুপান্তরিত করে বাংলার সম্ভাবনাময় তারুণ্যের জাগরণই হবে নব বিপ্লবের উত্থান।

সর্বোপরি, এই শোকের দিনে বাংলার সেই মহান ব্যক্তিত্বদের প্রতি জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। তাঁদের মহাদর্শে অনুপ্রাণিত হোক তরুণ সমাজ, চিরভাস্বর হোক তাঁদের কর্মময় জীবন।

আর সেখান থেকে শিক্ষা নিয়ে তারুণ্যের হাতে গড়ে উঠুক অসাম্প্রদায়িক, সাম্যের, গনতন্ত্রের প্রিয় স্বদেশ।

-সঞ্জিত শর্মা, এমএস ইন একুয়াকালচার, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।

‘তাঁরা বেঁচে থাকলে দেশ আরও এগিয়ে যেত’

’৭১-এ পাকিস্তানি বাহিনী ও আলবদর-আলশামস-রাজাকারদের সংঘটিত গণহত্যায় ৯৯১ জন শিক্ষাবিদ, ১৩ জন সাংবাদিক, ৪২ জন আইনজীবী, ১৬ জন শিল্পী-সাহিত্যিক প্রাণ হারান। বুদ্ধিজীবীরা হলেন জাতির বিবেক। তাঁরা অন্ধকারে আলো জ্বালান। একটি জাতিকে মেধাগত দিক থেকে এগিয়ে নেন।

বুদ্ধিজীবীরা সমাজের মূল সমস্যাগুলোর সমাধান এবং সমাধানের পদ্ধতির প্রস্তাব দিয়ে থাকেন। জিন-পল সার্টার বলেন, বুদ্ধিজীবীরা হল সময়ের নৈতিক চেতনা। তাই তাঁদের নৈতিক দ্বায়িত্ব হল সামাজিক ও রাজনৈতিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ করা এবং তাঁদের চেতনা অনুযায়ী নিজ নিজ সমাজের প্রতি স্বাধীনভাবে কথা বলা।

পরাজয় অবধারিত জেনে পাকিস্তানীরা নবগঠিত দেশকে সাংস্কৃতিক, সামাজিক ও শিক্ষাগত দিক থেকে দুর্বল করে দেয়ার পরিকল্পনা করতে থাকে। কুচক্রী জনগোষ্ঠীর সহায়তায় দেশের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের নিজ নিজ গৃহ হতে তুলে এনে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করে।

আজ বুদ্ধিজীবীরা বেঁচে থাকলে এদেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান আরও উন্নত হতো, মানুষের মাঝে সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনী শক্তি বৃদ্ধি পেতো; যা দেশ ও মানুষের কল্যাণে অনেক বেশি ভূমিকা রাখত। তরুণদের উচিত বুদ্ধিজীবীদের সম্মান করা, তাদের পরিকল্পনা অনুসরণ করে সবার একান্ত প্রচেষ্টায় দেশের উন্নয়নে কাজ করে যাওয়া।

-আবু ফরহাদ, কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং, ২০১৫-১৬, রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

‘বুদ্ধিজীবী স্মৃতি পাঠাগার স্থাপন করা প্রয়োজন’

১৯৭১ সালের (১০-১৪) ডিসেম্বর পাকসেনারা বাংলাদেশের প্রথম শ্রেণীর সকল বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করে। এ কাজে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে হাত ছিল এদেশের কিছু কলঙ্কিত সন্তানের। প্রথম থেকে শেষ ভুক্তি পর্যন্ত বুদ্ধিজীবীদের ধরে নিয়ে গিয়ে হত্যা করার মধ্যে একটা নকশা, একটা পরিকল্পনা, একটা প্যাটার্ন বোঝা যায়।

বেশির ভাগ বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবী, শিক্ষক, সমাজকর্মীদের তালিকা করে, বাছাই করে, টার্গেট করে মারা হয়েছে। এটি ছিল তাঁদের পরাজয় পরিকল্পনার শেষ এবং বৃহত্তম অংশ। শ্রেষ্ঠ মানুষগুলোকে হারানোর ক্ষতিপূরণ আজও এই জাতি পায়নি। এই হত্যাকাণ্ড যারা ঘটিয়েছে, পরিকল্পনা করেছে, কার্যকর করেছে, যারা তাঁদের সহযোগিতা করেছে, তাঁদের ক্ষমা করা অসম্ভব।

তরুণরা যেন এই মর্মবেদনা থেকে শিক্ষা নিতে পারে তাই সরকারের উচিত প্রতি উপজেলায় বুদ্ধিজীবী স্মৃতি পাঠাগার স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া। কারণ আমরা জানি, কিছু অপশক্তি আছে যারা নিজেদের স্বার্থে আমাদের শ্রেষ্ঠ সন্তানদের হারানোর ইতিহাসকে বিকৃত করতে চায়। বর্তমান দেশের মূল হাতিয়ার “তারুণ্য শক্তিই” পারে সকল বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটিয়ে নতুন বাংলাদেশ উপহার দিতে।

-স্নেহাশীষ কুমার রিংকু, বি.এড, ২০১৬-১৭, ময়মনসিংহ টিচার্স ট্রেনিং কলেজ।

‘শহীদ বুদ্ধিজীবীরা তারুণ্যের পাথেয়’

ডিসেম্বরে আমরা গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের, যাদের আমরা হারিয়েছি স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা থেকে শুরু করে চূড়ান্ত বিজয়ের আগ মূহুর্ত পর্যন্ত। দীর্ঘ নয় মাস রক্তক্ষয়ী মুক্তিসংগ্রামের শেষলগ্নে জাতি যখন বিজয়ের দ্বারলগ্নে, ঠিক তখনই ১৪ ডিসেম্বরের সেই কালোরাতে বাঙালি মেধার নৃশংস নিধনযজ্ঞ চলে, যা বিশ্বকে হতবিহ্বল করে তুলেছিল।

তাদের এ হত্যাযজ্ঞের আসল উদ্দেশ্য ছিল বাঙালি জাতিকে মেধাশূন্য করা। কেননা একটি জাতিকে ধ্বংস করতে চাইলে তার মেধার ধ্বংসই যথেষ্ট। তাঁদের এ হত্যাযজ্ঞে মুনীর চৌধুরী, ড. আনোয়ার পাশা, শহীদুল্লা কায়সার সহ আরও অনেক জ্ঞানরত্নকে হারিয়েছি। পরিকল্পনাকারী সেইসব কাপুরুষদের যথাযথ বিচার করার মাধ্যমে আমরা শহীদদের প্রতি সম্মান জানাতে পারি।

শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রত্যেকের জীবনী ছিল অসাধারণ। তাঁরা বিভিন্ন গুনে গুণান্বিত ছিলেন। তাঁদের প্রত্যেকের জীবনী একজন তরুণের জন্য পাথেয় হতে পারে; তাঁদের দেখানো পথ অবলম্বন করে দেশ ও জাতিকে একটি স্বাস্থ্যকর রাষ্ট্র উপহার দিতে পারে।

-আতিকুর রহমান আতিক, এমবিবিএস, ২০১৫-১৬, কুষ্টিয়া মেডিক্যাল কলেজ।

‘শহীদ বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে চর্চার প্রয়োজন’

১৪ ডিসেম্বর বাঙালি জাতির ইতিহাসে এক কালো অধ্যায়। বুদ্ধিজীবীদের হত্যাকাণ্ড একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধগুলোর মধ্যে ঘৃণ্যতম অপরাধ। পাকবাহিনি চেয়েছিল স্বাধীনতার পথে এগিয়ে যাওয়া দেশটিকে মেধায়-মননে পঙ্গু করে দিতে। এই মাসে আমরা গভীর শোক ও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি জাতির সেই শ্রেষ্ঠ সন্তানদের।

তবে শহীদ বুদ্ধিজীবী দিবসে শুধু বুদ্ধিজীবীদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনই যথেষ্ট নয়, সেই সাথে সমাজে বুদ্ধিজীবীদের ভূমিকা সম্পর্কেও আলোচনা-সমালোচনা দরকার। তাঁদের চর্চা করার মাধ্যমে বর্তমান জেনারেশন পাবে প্রকৃত সাফল্য।

দেশের প্রত্যেক নাগরিকের জানা দরকার এদেশ কত বড় সম্পদ হারিয়েছে, কি সেই ইতিহাস! তাঁদের সৃজনশীলতার উন্মুক্তকরণ প্রয়োজন। এতে এদেশের কিশোর, তরুণ, যুবক উপলব্ধি করতে পারবে বাংলাদেশকে কতযুগ পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে সেই জাতিই সবচেয়ে বেশি উন্নত যারা শিক্ষা এবং গবেষণায় এগিয়ে।

আমাদের প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হতে হবে, শিক্ষা ও গবেষণায় নিজেদের যোগ্য ও মেধাবী জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে যেন আমরা পৃথিবীর বুকে দেশ হিসেবে সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারি। এতেই শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জ্ঞাপন এবং তাঁদের আত্মার মাগফেরাত কামনা হবে।

-আক্কাশ আলী, রসায়ন বিভাগ, ২০১৫-১৬, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রিয় পাঠক, আপনিও লিখতে পারেন আমাদের পোর্টালে। কোন ঘটনা, পারিপাশ্বিক অবস্থা, জনস্বার্থ, সমস্যা ও সম্ভাবনা, বিষয়-বৈচিত্র বা কারো সাফল্যের গল্প, কবিতা,উপন্যাস, ছবি, আঁকাআঁকি, মতামত, উপ-সম্পাদকীয়, দর্শনীয় স্থান, প্রিয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ফিচার, হাসির, মজার কিংবা মন খারাপ করা যেকোনো অভিজ্ঞতা লিখে পাঠান সর্বোচ্চ ৩০০ শব্দের মধ্যে। পাঠাতে পারেন ছবিও। মনে রাখবেন দৈনিক আলোকিত ভোর.কম পোর্টালটি সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন‌্য উন্মুক্ত। তাছাড়া, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার স্বাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবর অথবা লেখা মান সম্পন্ন এবং বস্তুনিষ্ঠ হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে। লেখা পাঠানোর ইমেইল- dailyalokitovor@gmail.com