শামীমা আক্তারের ছোট গল্প ‘শ্বেত নীড়’

প্রকাশিত: ১১:১৯ অপরাহ্ণ , ডিসেম্বর ১৬, ২০২০

‘শ্বেত নীড়’

-মোছাঃ শামীমা আক্তার

চৌরাস্তা থেকে মিনিট পাঁচেক হেঁটে বামে যে মোড়টা; ওদিক দিয়ে সোজা যেতেই প্রথম যে দোতালা বাড়ি, ওটাই নীরাদের বাড়ি। পুরো ধবধবে সাদা বাড়ি। বাড়ির সামনে গেইটের একপাশে সবুজ রঙের লেখা- “শ্বেত নীড়”। নীরার বাবার ধারণা সাদা রঙ শান্তির প্রতীক তাই এই বাড়ি যে দেখবে তার মনে শান্তি-শান্তি লাগবে। মোজাম্মেল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে মনোবিজ্ঞানের অধ্যাপক। ছেলে-মেয়েরা তাঁকে ভীষণ পছন্দ করে আবার ভয়ও পায়। তার বাড়ির চিত্রও একই। নীরা আর মুন দুজনই বাবার পাগল। মুন হলো নীরার ছোট ভাই। নীরা অবশ্য ওকে ডাকে গোল আলু বলে। এই তিনজনকে ঘিরেই নিলুফা বেগমের সংসার।

নীরা এবার মাস্টার্সে ভর্তি হবে। খুব বুদ্ধিমতী মেয়ে সে। পড়াশুনোয়ও বেশ ভালো। আজ নীরাকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসবে। বিষয়টাতে নীরা খুব বিরক্ত। কারন এইমাত্র তাকে নিলুফা বেগম এসে বললেন, তোর বাবা বললো আধঘন্টা পর তোকে নাকি ছেলেপক্ষ থেকে দেখতে আসবে। এসবের কোনো মানে হয়? এ কথা এই আধঘন্টা আগেই কেনো বলতে হবে! আরেকটু আগে বলা যেত না? একটা মানসিক প্রস্তুতির তো ব্যাপার আছে। নীরা জানে এটা তার বাবার কাজ। তিনি মাঝে মাঝেই এমন অদ্ভুত কাজ করে বসেন। নীরা ঘরের দরজা লাগিয়ে দিল এক ঘুম।

ঘুম থেকে উঠে দেখে বিকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা। চুপিচুপি মুনকে ডেকে বললো,
– কিরে গোল আলু, কেউ এসেছিল বাসায়?
– হু।

– কখন চলে গেল?
– যায়নি তো।

– মানে? কখন এসেছে?
– দুপুরেই।

– এখনো যায়নি কেনো!!
– আরে নীরাপু উনি তো যাবেন না আজ। কাল বা পরশু যাবে শুনলাম।

নীরার আরও মেজাজ খারাপ হলো। বাবা যে আমাকে বোকা বানিয়ে কি মজা পায় কে জানে! বসার ঘরে যেতেই দেখে এক অপরিচিত বালকের দিকে বাবা চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে আছে আর সামনে বসা বালকটি সোফায় বসে চা খাচ্ছে। নীরা সোজা সামনে গিয়ে বললো কি করছো টা কি তুমি বাবা? মোজাম্মেল সাহেব বললেন একটা পর্যবেক্ষণ চলছে। জয় কিভাবে চা পান করে সেটা দেখছি।

নীরা বললো,
– তোমার পর্যবেক্ষণের ফলাফল কি?
– ফলাফল কাল দেওয়া হবে।
– কেন এমন পাগলামো করছো বাবা?
– আহা তুমি বুঝবেনা। একটা মানুষ কিভাবে চা পান করে তা দেখে অনেক কিছু বুঝা যায়!

নীরা হতবাক। বাবা পাগলামো করে সেটা সে জানে কিন্তু এই বোকা গাধামার্কা ছেলেটা কে? নীরা ভাবছে নিশ্চয়ই বাবার কোনো ছাত্র। নম্বর পাওয়ার আশায় বাবার এসব সহ্য করছে। কিন্তু তাই বলে বাবাকে কখনো কাউকে বাসায় আনতে দেখেনি নীরা। তারমানে বাবার পাগলামো বাড়ছে। নীরা খুব বিরক্ত কিন্তু বাবাকে সে কিছুই বলতে পারেনা, মজা করে রাগ-অভিমান দেখালেও মোজাম্মেল সাহেব সেটা সহ্য করতে পারেন না। কষ্ট পান।

আজ সোমবার। ফলাফল দেওয়া হবে। সবাইকে বসার ঘরে ডেকে এনেছেন মোজাম্মেল সাহেব। সবাই বসে আছে শুধু জয় দাঁড়িয়ে। নীরার বাবা বললো, জয় তুমি পাশ করেছো। বাকিদের দিকে তাকিয়ে বললেন সবাই হাততালি দাও। মুন ছাড়া কেউই হাততালি দিল না। জয় এবার মুখ তুলে তাকালো।

মোজাম্মেল সাহেব বললেন, এবার তুমি আমার মেয়ের কাছে মতামত নিতে পারো। তোমাকে পুরস্কার স্বরূপ অনুমতি দেওয়া হলো। নীরা নিলুফা বেগমের দিকে তাকালো। তাকে বেশ স্বাভাবিক মনে হচ্ছে। নীরা কিছুই বুঝতে পারছে না।

জয় মোজাম্মেল সাহেবের দিক থেকে চোখ নামিয়ে বললো, আসসালামু আলাইকুম, নীরা। আপনাকে বিবাহ করিতে আমি ইচ্ছুক। আপনার মতামত স্যারের মাধ্যমে আমাকে জানাতে পারবেন। ভালো থাকবেন, আসি।
জয় চলে গেল। নীরা ঠায় দাঁড়িয়ে। কিছুই বুঝতে পারল না সে।

মোজাম্মেল সাহেব এবার নীরার মাথায় হাত রেখে বললেন ছেলেটা ভাল রে মা। কি সাহস দেখেছিস, একদম আমার কাছে চলে এসেছে সোজা তোর কথা বলতে। ছেলেদের সাহস না হলে হয় বলোতো নীরার মা!?

নীরা কিছু বললো না। সোজা ঘরে গেল। বাবার উপর সে বিরক্ত আবার মায়াও হচ্ছে। একটা ছেলে কোত্থেকে এলো আর তার নাকি পছন্দও হয়ে গেল! তাও আবার একমাত্র মেয়ের জন্য! নীরা জানে ছেলেটিকে বাবার খুব বেশি ভালো লেগেছে এজন্যই বাবা তাকে তার শান্তির নীড়ে এনেছে।

নীরা যদি না বলে দেয় বাবা হয়তো কিছুই বলবে না কিন্তু তারপরেও নীরার না বলতে ইচ্ছা হচ্ছে না। বাবাকে খুব ভালবাসে সে। নীরার কেনো জানি মনে হচ্ছে ছেলেটাও বাবার টাইপের মানুষ, একটু পাগল গোছের কিন্তু ভালো।

মুনকে ডেকে নীরা একটা কিটকেট চকলেট ধরিয়ে দিল। বললো যা বাবার কাছে গিয়ে বল যে “বাবা, নীরাপু আমাকে বলেছে তোমার সামনে এসে আরেকবার হাততালি দিতে।” ঠিক এভাবেই বলবি কিন্তু। মুন চকলেট নিয়েই ভো দৌড়!

নীরা মার কাছে গেল। গিয়ে বললো,
– আচ্ছা মা, তোমার জীবনের সবথেকে বিস্ময়কর খুশি কি?
– তুই!
– কি যে বলো না মা! আচ্ছা আমার জায়গায় তুমি হলে কি করতে?

– আমি জানি তুই কি করবি। আমিও সেটাই করতাম। আমি তো তোরই মা তাইনা!
নিলুফা বেগম হেসে ফেললেন। চোখের কোণে তার পানি চিকচিক করছে।

– তোমার খুব মন খারাপ তাইনা মা?
– না একদম না।
– আমি তোমার মেয়ে মা। তোমার মেয়েই থাকবো।

সূর্য ডুবছে। বারান্দায় নীরা দাঁড়িয়ে। কয়েকটা ঘন্টার মধ্যে কেমন যেন সব বদলে যাচ্ছে। হঠাৎ করে সে আনন্দ এবং মন খারাপ দুটোর মাঝখানে ভাসছে। হঠাৎ করে একটা অচেনা মানুষকে আপন মনে হচ্ছে। নিজের ঘরটার দিকে তাকিয়ে মায়া হচ্ছে। তবে সবকিছুর মধ্যেও একটা বিষয় নিয়ে সে খুব শান্তি পাচ্ছে মনে মনে, যাক বাবা তো খুশি! এ কেমন যেন এক স্বার্থকতা। বাবা নিশ্চয় এতক্ষণে তার জয়কে জানিয়ে দিয়েছে সুখবর..হয়তো তাদের প্রস্তুতি চলছে…নীরাকেও প্রস্তুতি নিতে হবে। অনেক আপন কিছুকে দূরে রেখে চলার প্রস্তুতি।

আজ ১৭ই ফাল্গুন। জয়ের সাথে নীরার বিয়ে হয়ে গেলো। শ্বেত নীড় আজ ভীষণ ফাঁকা। প্রথম বারের মতো মোজাম্মেল সাহেবের মনে হচ্ছে বাড়িতে সাদা রঙটা ঠিক মানাচ্ছে না, আগের মতো চকচক করছে না। নিলুফা বেগমের মন খারাপ। যেন সে খুব একা হয়ে গেছে। চোখ ভরা জল নিয়ে বসে আছে। মোজাম্মেল সাহেব বললেন,
– নীরার মা, তোমার মনে আছে যেদিন নীরাকে এনেছিলাম প্রথম সেদিনের কথা? কত ছোট ছিল আমার নীরু তাইনা?

– মনে আছে। সাদা ধবধবে একটা জামা গায়ে যেন এক সাদা পরী! আমাকে ভাঙা-ভাঙা শব্দে বলে, তুমি কে? আমি বলেছিলাম আমি তোর মা। নীরু আমাকে সেই মূহুর্তে মা বলে ডাকলো। সেই প্রথম মা ডাক…..আমিতো কেঁদেই ফেলেছিলাম!

মোজাম্মেল সাহেব কিছু বললেন না। বুকে চিনচিন ব্যাথা করছে। চুপচাপ শুয়ে পড়লেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, নীলুফা, বাড়ির রঙ সাদাই থাক। ওটা আমাদের নীরুর রঙ। আচ্ছা, নীরু তো নেই আজ রাতটা আমরা নীরুর ঘরে গিয়ে ঘুমোই?

লেখক-শিক্ষার্থী, ইনফরমেশন সায়েন্স এন্ড লাইব্রেরি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রিয় পাঠক, আপনিও লিখতে পারেন আমাদের পোর্টালে। কোন ঘটনা, পারিপাশ্বিক অবস্থা, জনস্বার্থ, সমস্যা ও সম্ভাবনা, বিষয়-বৈচিত্র বা কারো সাফল্যের গল্প, কবিতা,উপন্যাস, ছবি, আঁকাআঁকি, মতামত, উপ-সম্পাদকীয়, দর্শনীয় স্থান, প্রিয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ফিচার, হাসির, মজার কিংবা মন খারাপ করা যেকোনো অভিজ্ঞতা লিখে পাঠান সর্বোচ্চ ৩০০ শব্দের মধ্যে। পাঠাতে পারেন ছবিও। মনে রাখবেন দৈনিক আলোকিত ভোর.কম পোর্টালটি সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন‌্য উন্মুক্ত। তাছাড়া, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার স্বাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবর অথবা লেখা মান সম্পন্ন এবং বস্তুনিষ্ঠ হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে। লেখা পাঠানোর ইমেইল- dailyalokitovor@gmail.com