যৌতুকের আধুনিক নাম খুশি মনে যা দিবেন

প্রকাশিত: ৮:২৬ পূর্বাহ্ণ , ডিসেম্বর ১৯, ২০২০

যৌতুক দিবেন না, যৌতুক নিবেন না। মুখেমুখে স্লোগানটি আমরা সবাই মিলে দিলেও বাংলাদেশে যৌতুক আদান-প্রদান শতকরা হারটা এখনও ১০০ শতাংশেই রয়ে গেছে। কিন্তু আজকাল সমাজে সেটিকে আর যৌতুক বলে গ্রহণ কিংবা প্রদান করা হয় না।

হিন্দু আইন অনুযায়ী মেয়েরা বাবা মায়ের সম্পত্তির উত্তরাধীকারী হতে পারে না। তাই হিন্দু ধর্মে বিয়ের সময়ে মেয়ের সাথে উপঢৌকন স্বরূপ সম্পত্তি প্রদান রীতিমত বৈধ। বাঙালি মুসলমানরা অবশ্য এই প্রথাকে পূর্ব পুরুষদের ঐতিহ্য হিসেবে আত্মীকরণ করেছে।

বর্তমান মুসলমান সমাজ যৌতুকের বিরুদ্ধে স্লোগান দেয়, যৌতুককে ঘৃণা করে বললেও তাদের মেয়ের বিয়ের সময় মেয়ের কিছু না কিছু মাল-সামান প্রদান করেই থাকে। আবার ছেলেদের বিয়েরসময় কনেপক্ষের নিকট থেকে অনুরূপ তার থেকেও বেশি কামনা করে থাকে। কখনো কেউ চিন্তাও করে না যে এটিই যৌতুকের আধুনিক রূপ।

অথচ ইসলামে সুস্পষ্টভাবে বলায় হয়েছে কনেপক্ষ থেকে উপঢৌকন স্বরূপ কোনকিছু গ্রহণের কোন বিধান ইসলামে নেই। তবুও যুগ-যুগ ধরে এই কলঙ্কজনক প্রথাকে তারা লালন করেই চলছে।

সমাজ বিজ্ঞানীদের ভাষ্যমতে কোন সমাজে বে-আইনি কাজ যখন সবাই মিলে করতে শুরু করে তখন সেটাই পরবর্তীতে প্রথায় রূপান্তরিত হয়। তখন সেটাকে কেউ অপরাধ মনে করে না।

হিন্দু সংস্কৃতি এবং ধর্মীয় প্রথা হিসেবে যৌতুক প্রথা বাঙালি সমাজে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রথায় পরিণত হয়েছে। যার ফলে সতীদাহ প্রথা, কৌলীন্য প্রথা, বিধবা বিবাহ বিরোধী প্রথা বিলুপ্ত হলেও যৌতুক প্রথা এখনও প্রচ্ছন্নভাবে বাংলাদেশের সমাজে প্রচলিত রয়েছে।

কুসংস্কার এবং অনৈতিক প্রথাকে সমাজে টিকিয়ে রাখতে সবসময় খোঁড়া যুক্তির আশ্রয় নেয়া হয়। নিরবতা, নিমরাজি কিংবা নাম পরিবর্তন করে চালিয়ে নেয়া হয়। (উদাহরনস্বরূপ, সুদ খাওয়া হারাম কিনুত্ম মুনাফার নামে আমরা অবলীলায় খাচ্ছি)।

বিয়ের সময় মেয়েদের সাথে কোন উপঢৌকন প্রদান যৌতুক প্রথার আধুনিক ভার্সন।আজকাল আমরা সভ্য হয়েছি। তাই এটিকে যৌতুক বলে গ্রহণ করতে নারাজ। অথচ এটি গ্রহণের লোভও সামলানো কঠিন। তাই বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছি।

প্রত্যেকটা বরপক্ষের উক্তি, আমরা শুধু মেয়েকেই চাই। অন্য কিছু নয়। আপনাদের যা ইচ্ছে হয় আপনাদের মেয়ের সাথে দিবেন। এখানে আমাদের বলার কিছু নেই। অনেকে আবার চাতুর্যতার সাথে বলেন, ‘আমরা শুধু মেয়েকে চাই। তবে যেভাবে চলছে সমাজে যেমন একটা মোটরসাইকেল, টিভি, ফ্রিজ, সোফাসেট এসব কি আর বলতে হয়। আমরা এসব খুঁজেটুজে ছোটলোক হতে চাইনা।

কেউ কেউ বলেন, আমরা খুঁজেটুজে কোন কিছু আনবনা। তবে তারা খুশি হয়ে যা দেবে তা নিতে কুণ্ঠিত হবনা। অনেকে আবার খুঁজে আনাকে যৌতুক মনে করলেও না খুঁজে আনাকে সেটি মনে করেন না। তাদের উক্তি, আমরা তো কিছু চাচ্ছিনা। তারা খুশি হয়ে দিলে কেন গ্রহণ করবনা।

এই ধরনের গ্রহণকে কেউ যৌতুক বলে গণ্য করেন না যদিও যৌতুক প্রদান বা গ্রহণ, ইত্যাদির দণ্ড সম্পর্কে যৌতুক নিরোধ আইন ২০১৮ এর ৪ নং ধারায় বলা হয়েছে যদি বিবাহের কোনো এক পক্ষ যৌতুক প্রদান বা গ্রহণ করেন অথবা যৌতুক প্রদান বা গ্রহণে সহায়তা করেন বা যৌতুক প্রদান বা গ্রহণের উদ্দেশ্যে চুক্তি করেন, তাহা হইলে তাহার এই কাজ হইবে একটি অপরাধ এবং তজ্জন্য তিনি অনধিক ৫ (পাঁচ) বৎসর কিন্তু অন্যূন ১ (এক) বৎসর কারাদণ্ড বা অনধিক ৫০,০০০ (পঞ্চাশ হাজার) টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডনীয় হইবেন।

এ আইন শুধু আইনের মাঝেই সীমাবদ্ধ রয়েছে প্রয়োগ হয়না।

গভীর ঘুমে নিমগ্ন ব্যক্তিকে জাগিয়ে তোলা সহজ। কিন্তু যে/যারা জেগে থেকে ঘুমিয়ে রয়েছে তাদের জাগিয়ে তোলা বড্ড কঠিন। প্রচ্ছন্ন এই যৌতুকের ব্যাপারে আমাদের সমাজ তেমনি জেগেজেগে ঘুমুচ্ছে।

যততারাতারি সম্ভব জেগে জেগে ঘুমানো বন্ধ করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই সমাজ থেকে যৌতুকের মূল উৎপাটন করা সম্ভব নচেৎ নয়।

লেখকঃ মোঃ লিখন হোসেন (নিরব)
শিক্ষার্থী, সমাজকল্যাণ বিভাগ, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়।

দৈনিক আলোকিত ভোর/ মাহমুদ/ লিখন

প্রিয় পাঠক, আপনিও লিখতে পারেন আমাদের পোর্টালে। কোন ঘটনা, পারিপাশ্বিক অবস্থা, জনস্বার্থ, সমস্যা ও সম্ভাবনা, বিষয়-বৈচিত্র বা কারো সাফল্যের গল্প, কবিতা,উপন্যাস, ছবি, আঁকাআঁকি, মতামত, উপ-সম্পাদকীয়, দর্শনীয় স্থান, প্রিয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ফিচার, হাসির, মজার কিংবা মন খারাপ করা যেকোনো অভিজ্ঞতা লিখে পাঠান সর্বোচ্চ ৩০০ শব্দের মধ্যে। পাঠাতে পারেন ছবিও। মনে রাখবেন দৈনিক আলোকিত ভোর.কম পোর্টালটি সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন‌্য উন্মুক্ত। তাছাড়া, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার স্বাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবর অথবা লেখা মান সম্পন্ন এবং বস্তুনিষ্ঠ হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে। লেখা পাঠানোর ইমেইল- dailyalokitovor@gmail.com