প্রথম বাবা হবার অনুমতি

প্রকাশিত: ১:২৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৯, ২০২১

প্রথম বাবা হবার অনুমতি

শরিফুল খান প্লাবন :- ২০১৯ সালের জুলাই এর ২৭ তারিখ জীবনসঙ্গী নিয়ে নতুন দিগন্তে পা রাখা।এর পর থেকে কিছু স্বপ্ন রোগ হয়ে স্বপ্নময় জীবন গড়া শুরু।

১৭ জুলাই ২০২০ শুক্রবার সকাল ছয়টার দিকে জানলাম আমি বাবা হতে চলেছি।কথাটা শুনার পরে কতটা খুশি হলাম বলে বুঝাতে পারবো না।

প্রথমে আমরা দুজন ছিলাম। আমাদের হাতে হাত রাখার জন্য আরেকজন অতিথির আগমন ঘটতে যাচ্ছে।এই জীবনে প্রথম বাবা হবো। আমার ঘরে একটি চাঁদ আসবে।সেই চাঁদে আলোকিত হবে পুরো ঘর।আর তাকে নিয়ে আমাদের স্বপ্নময় একটি সংসার হবে।

চোখের সামনে ধীরে ধীরে আমার সন্তান স্ত্রীর গর্ভে বেড়ে উঠছে।তাকে নিয়ে কত পরিকল্পনা। স্ত্রীর প্রশ্ন- তুমি ছেলে চাও নাকি মেয়ে? আমার কথা ছিল- সুস্থ সন্তান। আমাদের মধ্যে কথা বলার টপিক বদলে গেলো।

একটি সন্তান পৃথিবীতে ভূমিষ্ঠ হতে মায়ের ভূমিকা যে কি তা আমি দেখেছি আমার বোনদের মাধ্যমে। আমার স্ত্রীর সেই ‌ জার্নিতে।

ছোট ভাইয়ের বউকে সাথে করে ওকে নিয়ে চলে গেলাম শ্রীনগর ইয়াসমিন দেলোয়ার হাসপাতালে।ডাক্তার জামিলা মেডামকে দেখালাম। তিনি সপ্তাহে একদিন সোমবার শ্রীনগর ইয়াসমিন দেলোয়ার হাসপাতালে আসেন।

আমি কাজের ক্ষেত্রে ঢাকা থাকি তাই শুরু থেকে চিন্তা ছিল ঢাকাতে একটা ভালো হাসপাতালে চিকিৎসক দিয়ে সঠিক সেবা নিশ্চিত করা। সেজন্য ঢাকায় জুরাইনে অবস্থিত আদ দ্বীন হাসপাতালে ডাক্তার মাহাবুবা সিদ্দিকা মেডামকে দেখালাম।

গর্ভে সন্তান আসার প্রথম তিন মাস অনেক কষ্ট করেছে সে। আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছি। কিছুই করার ছিল না। কষ্ট গুলো নিজের মধ্যে অনুভব করা ছাড়া আর কি করার আছে তাও বুঝে উঠতে পারিনি।

প্রতিদিন নতুন নতুন অভিজ্ঞতা পেয়েছি। বিবাহিত বন্ধু বান্ধব, ইউটিউব থেকে জেনে নিয়েছি। কি কি করলে পেটের সন্তান সুস্থ থাকবে? কি করলে সন্তানের সঙ্গে সঙ্গে মায়ের স্বাস্থ্য ও ভালো হবে? আমার মা,বোন আর ছোট ভাইয়ের বউকে দেখেছি সব সময় তাকে মানুষিক শক্তি দিতে।তাকে দিয়ে কোন কাজ করানো জাবেনা। এককথায় বলতে গেলে ওর উপর সবার একটু বেশি যত্ন।

দিনে দিনে বাচ্চা কতটুকু হচ্ছে? কত সপ্তাহে তার ওজন কতটুকু হয়? কত কি যে জানার চেষ্টা, ব্যকুলতা দুজনার।আমার স্ত্রীর আমার মায়ের সাথে শ্রীনগর থাকতো।স্ত্রীর এ সময়টাতে স্বামী কাছে থাকলে বেশি ভালো হয়। কিন্তু জীবন তো বিচিত্র। বাস্তবতা দুজনকে দূরে রেখেছে।

আমি সপ্তাহে বৃহস্পতিবার গ্ৰামের বাড়ী আসতাম। আমি পেটের উপর হাত দিয়ে,কান পেতে আমার সন্তানের হৃদস্পন্দন অনুভব করছি।পেটের মধ্যে সন্তানের নড়াচড়া অনুভব করার অনুভূতি ভাষার প্রকাশ করার মত ভাষা খুঁজে পাইনা।

আমার বড় ভাগ্নী রাতিকা দশটা ছেলে আর দশটা মেয়ে বাবুর নাম ঠিক করেছে।সবাই একসাথে বসে নাম ঠিক করা হবে।আমার আরেক ভাগ্নী মৃদুলা প্রথম থেকেই বলছে মেয়ে বাবু হবে।

আমার ছোট ভাগ্নী মেহেক ও বলে মেয়ে বাবু হবে।ভাতিজা বলে আপা হবে। আমার এক মাত্র ভাগিনা তাসফিক কে ভাগ্নী মৃদুলা বলেছে মামা মেয়ে বাবু কিনে আনবে।তাই ভাগিনা আমার উপর ভিসন রাগ আমি কেনো মেয়ে বাবু কিনে আনছি।

৫ ডিসেম্বর আমার স্ত্রীকে ডাক্তার দেখাতে আমার মেজু বোনের বাসা ওয়ারী গেলাম।বড় ভাগ্নী ও এলো রাতে নাম ঠিক করার জন্য অঘোষিত বোর্ড মিটিং বসলো।মৃদুলা বলে মামার সাথে মিল রেখে নাম রাখবো। কারন আমাদের বোন হবে। বোর্ড মিটিং এ তিনটা করে নাম ঠিক করা হলো।

আগামী কাল চিকিৎসক আল্ট্রাসোনোগ্রাফী করবেন।তখন জানা যাবে ছেলে নাকি মেয়ে হবে। স্ত্রী কে নিয়ে হাসপাতালে গেলাম।সবাই অধির আগ্রহে নিয়ে আছে।গ্ৰাম থেকে মাও বার বার ফোন করছে।

তবে আদ দ্বীন হাসপাতালে বলার নিয়ম নেই সন্তান ছেলে নাকি মেয়ে।তার পরেও আমি অনেক অনুরোধ করে জানতে পারলাম আমার মেয়ে হবে। ডেলিভারির তারিখ দিল ২৮ মার্চ।

আমিতো মহা খুশি। আমার স্ত্রী চেয়েছিল প্রথম সন্তান ছেলে হোক।সবাইকে ফোন করে জানানো শুরু করলাম হাসপাতাল থেকেই।আমার মা মহা খুশি।তার পান বানিয়ে দেয়ার মত কেও আসছে। আমার শশুর বাবা, শাশুড়ি মা সবাই মহা খুশি।

রাতে আবারো নাম ঠিক করার জন্য সবাই বসলাম। অবশেষে ভাগ্নী রাতিকা বললো “ইন্নাস সাফা খান”।আমার স্ত্রী বললো “সাফা বিনতে সজিব”।সবার মতামতের ভিত্তিতে নাম ঠিক করা হলো ” ইন্নাস সাফা খান।

এদিকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। আমি ভিসন চিন্তিত হয়ে পরলাম। কারন আমার স্ত্রী ফজলুল হক মহিলা বিশ্ববিদ্যালয়ে থেকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স করছে। টেস্ট পরীক্ষার অংশ গ্রহণ করতে পারেনি।

এদিকে ফর্ম পূরণ এর সময় ঘোষণা করেছে। শুনছি মার্চ মাসে ফাইনাল পরীক্ষা হবে। আমি তো ভিসন চিন্তিত ফর্ম ফিলাপ করব কিনা।

আমার স্ত্রীর ও ভেলিভারির সময় কাছাকাছি। ডাক্তার লং জার্নি করা থেকে বিরত থাকতে বলেছেন। আমি নামাজ পরে আল্লাহ কাছে দোয়া করেছি আল্লাহ পরিক্ষাটা এমন সময় দিও যেন আমার স্ত্রী অংশ গ্রহণ করতে পারে। সিদ্ধান্ত নিলাম ফর্ম ফিলাপ করাবো।

১৮ ফেব্রুয়ারি গেলাম কলেজে ওর শারীরিক অবস্থার দেখে কলেজের শিক্ষকরা ওর ফর্ম ফিলাপটা সবার আগে করে দিল।আল্লাহ রহমতে সবকিছু ঠিকঠাক করে ডাক্তার দেখিয়ে গ্ৰামে চলে আসলাম।

তার কিছু দিন পরে শিক্ষামন্ত্রী দিপু মনি ঘোষণা দিলেন ২৪ শে মে এর আগে কোন বিশ্ববিদ্যালয় খোলা হবেনা। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললাম। তাহলে ২৪ শে মে এর আগে আর পরিক্ষা হবার সম্ভাবনা নেই।

আমার বড় বোন বললো তুই ওকে (স্ত্রী) আমার বাসায় দিয়ে যা। আমার এই বোনের বাসা কেরানীগঞ্জে। বড় বোনের কথা মত ওকে মার্চ মাসের ৫ তারিখে দিয়ে আসলাম। বড় বোনের বাসায় ওকে রেখে আসার সময় আমার অনেক খারাপ লাগছিল।

আমার কিছুতেই আস্তে মন চাইছে না। ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আমি কথা বলতে পারছিনা। চাকরি করি জেতে তো হবে।ওকে রেখে আসলাম ঠিকই আমার মনটা ওর কাছেই রয়ে গেল।

প্রতিটা দিন কাটে নতুন অতিথির অপেক্ষায়।যখন ওর সাথে হোয়াটসঅ্যাপ কথা বলি। আমি কেনো জানি ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারিনা। কি যে কষ্ট সন্তানের মা হওয়া তা চোখে না দেখলে বোঝা যেতো না।শেষ মুহূর্তে তার নড়াচড়া করতেও কষ্ট হতো।

কথা ছিল ১২ মার্চ শুক্রবার আমি বড় বোন এর বাসায় কেরানীগঞ্জ জাবো। কিন্তু বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই মনটা যেনো কেমন লাগছে।আমার স্ত্রী বেশ কয়েক বার ফোন করে বললো আজকে তুমি আসো।আমার ভালো লাগছেনা।আমি আমার মেজু দুলাভাই কে বলে অফিস থেকে সন্ধ্যা পরে বের হলাম বড় বোনের বাসায় যাওয়ার জন্য।

সন্ধ্যায় বড় বোনের বাসায় গিয়ে ওকে দেখে বুঝলাম ওর শরীরটা ভালো না।কেও কিছু বললো না আমাকে। বাসায় একজন মহিলা দেখলাম।বড় বোন বললো তুই একটু নিচ থেকে ঘুরে আয়।তখন আমার বুঝতে বাকী রইলো না।

বাসায় সবার সামনেই আমি আমার স্ত্রীর কে জরিয়ে ধরলাম।ওকে আল্লাহ আল্লাহ বলতে বললাম।বললাম সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে।

রাত ৯ টা বাজে বড় বোন আমাকে বললো আর দেরি করবো না এখনি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে। আমি বললাম সদরঘাট পার হয়ে কি ভাবে আদ দ্বীন হাসপাতালে নিয়ে যাবো? তাছাড়া বৃহস্পতিবার হয়াতে এমনি জাম অনেক বেশি ছিল সেই দিন।

বড় বোন বললো এখানে সাজেদা হাসপাতাল আছে এখানে চল। ৯ টা ৫০ মিনিটে সাজেদা হাসপাতালে গেলাম। যাওয়ার সাথে সাথে ওকে অক্সিজেন লাগালো।

ডাক্তার ওকে দেখে আমাকে বললো দেখেন বর্তমানে যে ব্যাথা এই ব্যাথা সয্য করতে পারছেনা।এখন যে ব্যাথা এর চাইতে আরো অনেক বেশি ব্যাথা হবে। ভোর রাত যদি বলেন ব্যাথা সয্য করতে পারছেনা আমরা সিজার করতে চাই তখন কিন্তু ডাক্তার থাকবে না। তাছাড়া বাবুর নড়াচড়া কম করছে।আপনি রুগির সাথে কথা বলে আমাদের ১০ মিনিটের মধ্যে জানান।

আমি আমার বড় বোন আর আমার বড় খালা শাশুড়ি ওর সাথে কথা বলি কিন্তু আমার স্ত্রী কিছুতেই সিজার করাতে রাজি হচ্ছেছিল না।ওর কথা আমি পারবো আমি আরো কিছু সময় দেখতে চাই।

কিন্তু কিছু তেই কিছু হচ্ছে না। পরে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম সিজার করাবো।ডাক্তার বললো রাত ২টা ৩০ মিনিটে সিজার হবে। আমি আর আমার বড় বোন কাউন্টারে গিয়ে টাকা জমা দিয়ে এলাম।এই সময় দেখি আমার মেজু দুলাভাই হাসপাতালে।

হাসপাতালে আমার শশুর বাড়ীর থেকে অনেকেই আসছে।আমার শশুর শাশুড়ি বিক্রমপুর থাকে বলে এতো রাতে আসতে পারেনি।

আমার স্ত্রী ভয় পাচ্ছে।ভয় পাওয়ারই কথা। সবাইকে রেখে অপারেশন থিয়েটারে যেতে হচ্ছে। আমি চেয়ে চেয়ে দেখেছি। কিছুই করার নেই শান্তনা দেওয়া ছাড়া।সেটুকুও দিতে পারিনি।সবার সামনে চোখের ইশারা দিয়ে তাকে বিদায় দিয়েছি।

আমার আর ধৈর্য নেই। অস্থিরতা কাজ করছে। অপারেশন থিয়েটারের বাইরে থেকেই আওয়াজ পেলাম শিশুর কান্না।তার কিছুক্ষন পরে দেখলাম একটি শিশুকে নিয়ে একজন নার্স বের হলেন।বলে আপনার মেয়ে হয়েছে।প্রথমে আমার বড় বোন কুলে নিলেন।সবার চোখে মুখে আনন্দের বন্যা।

আমি নার্সের কাছে জানতে চাইলাম মেয়ের মা কেমন আছেন? তিনি বললো এখনো অপারেশন চলছে।বেড এ ১২ ঘন্টা পরে দিবে।বড় বোন মেয়েকে আমার কুলে দিলেন।তখন মে আমার কত আনন্দ লাগছিলো এটা লিখে বুঝানো যাবেনা।

মা ছোট ভাইয়ের বউকে নিয়ে অনেক সকালে হাসপাতালে।তাদের চোখে আনন্দের ছোঁয়া।ভাতিজা আমার বোনকে কুলে নিয়ে মহা খুশি। বিকেলে শাশুড়ি মা শালিকাকে নিয়ে আসলো। শশুর বাবা কাজের জন্য আসতে রাত হয়েছে।আমার ছোট বোন আর মেজ বোন ঘন্টায় ঘন্টায় ফোন করে মা মেয়ের খবর নিচ্ছে।

প্রথম সন্তানের বাবা হওয়ার অনুভূতি ভাষার লিখে প্রকাশ করা যাবে না।তার উপর প্রথম কন্যা সন্তান।সবাই বলে তার প্রথম কন্যা সন্তান হয় তার সৌভাগ্যের দরজা খুলে যায়।

তুই সারাজীবন বাবার হাতে নিয়ে থাকবি। তোর মাঝে আমি আমাকে প্রতিষ্ঠা করতে চাই। আমার না পাওয়াগুলো তুই পুরন করবি। তোর কাছে একটাই চাওয়া জীবনে হতাশ হই না, অল্পতেই সন্তুষ্ট থাকবি, অহংকার, ঘৃণা যেন তাকে স্পর্শ করতে না পারে। সর্বোপরি একজন মানুষ হয়ে উঠবি। যে হবে মানবিক ও শিক্ষিত মানুষ।

ফেসবুকে আমরা

পুরাতন সব সংবাদ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
এই মাত্র পাওয়া