২০ এর বিভ্রান্তি থেকে ২১ হোক শুদ্ধ

প্রকাশিত: ৯:৫৩ অপরাহ্ণ , জানুয়ারি ৭, ২০২১

মো.সুমন সরকারঃ কবির ভাষায় বলতে গেলে এক গ্লাস অন্ধকার হাতে নিয়ে বসে আছি। গ্লাস ভর্তি ২০২০ সালের সব তিক্ত অভিজ্ঞতা। মাঝে মাঝে দেখেছি গ্লাসের গায়ে আশার আলো নিয়ে বসেছে কিছু জোনাকিপোকা। সেই আলোর পরশে গ্লাস ভর্তি অন্ধকারেও কখনো মিলেছে সামান্য স্বস্তি।

২০২০ সাল আমাদের বাস্তব জীবনে পরিবর্তনের একটি বছর। যা দৈনন্দিন জীবনে চলার পথে পদে পদে পরিবর্তন নিয়ে এসেছে। বদলে দিয়েছে মানুষের জীবন ধারা সফলতার গতিপথ।

২০২০ সালের পুরোটাই ছিল করোনা ভাইরাস মহামারীর কারণে বিধ্বংসী একটি বছর। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশকেও বিপর্যস্ত করেছে এই ভাইরাস। ২০২০ সাল অবসানের পরও তার আঘাতের ক্ষতগুলো মানুষের জীবন থেকে এতো দ্রুত শেষ হবে না। অন্য যে কোন বিদায়ী বছরের চেয়ে ২০২০ ছিল একদম ভিন্ন।

কারণ ২০২০ সালের শুরুতেই মানুষকে হতবাক করে দেয় মহামারী করোনা ভাইরাস। বাংলাদেশে মার্চে প্রথম করোনা ভাইরাস শনাক্তের সাথে সাথেই পাল্টে যেতে শুরু করে দেশের সার্বিক পরিস্থিতির চিত্র। এমনকি বাংলাদেশ সরকারের ঘোষণা করা মুজিব বর্ষের ব্যাপক আয়োজনও পুনর্বিন্যাস করতে হয় করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে।

সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা হয়। বন্ধ হয়ে যায় সকল যান চলাচল। সংক্রমিত এলাকা গুলোকে লকডাউন ঘোষনা করা হয়। ঘরে আবদ্ধ হয়ে পরে মানুষ। ধাপে ধাপে সংক্রমণ বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে সাধারন ছুটিও।

চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে আতঙ্ক সঙ্গে বিভ্রান্তি। নিয়মিত হাত ধোয়া, মাস্ক পরা, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখাসহ সকল স্বাস্থবিধি মেনে চলার দিকনির্দেশনা দেয় সরকার। অধিক পরিমাণে বেড়েছে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর সংখ্যা। টিকা আবিষ্কার হলেও বাংলাদেশে আসেনি এখনো। জীবনের ঝু্ঁকি নিয়েই করোনা মহামারীর সাথে লড়াই করে চলেছে সাধারণ মানুষ।

এছাড়াও বছর জুড়ে বেশ কয়েকটি ধর্ষণের ঘটনায় মানুষের মাঝে ব্যাপক ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। করোনা মহামারীর কারণে পাল্টে গেছে অর্থনীতির চাকাও।

করোনা মহামারীর কারণে ২০২০ সালে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। এছাড়াও আমাদের মতো বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ছাত্র ছাত্রীদের উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার আশাকে ব্যহত করেছে বারবার।

২০২০ সালের প্রায় সারা বছরই ক্যাম্পাস থেকে দূরে কেটেছে আমাদের মতো শিক্ষার্থীদের। অনেকে সবেমাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পা রেখেও প্রাপ্তির খাতায় হতাশা ছাড়া মেলাতে পারেনি কিছুই। অনেকে আবার বাসায় আবদ্ধ না থেকে উদ্যোক্তা হতে উদ্বুদ্ধ হয়েছে। অনেকে অনলাইনে ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেছে।

শুধু লেখা পড়া নয় বঞ্চিত হতে হয়েছে ক্যাম্পাসের চিরচেনা সৌন্দর্য উপভোগ থেকে। বন্ধু বান্ধব, ক্লাস, পরীক্ষা, আড্ডা, ঘোরাঘুরি সবই যেন ২০২০ সালটাতে স্তব্ধ হয়ে থেকেছে, যা মনে হয়েছে শুধুই স্মৃতিকথা।

২০২০ সালের প্রায় পুরোটা সময় ধরেই মিস করেছি ক্যাম্পাসে কাটানো চিরচেনা স্মৃতি গুলো। ধাপে ধাপে ছুটি বাড়তে থাকলেও প্রতিবার অপেক্ষায় থেকেছি এই বুঝি ক্যাম্পাস খুলে দেবে পরে বন্ধের নতুন তারিখ দেখে আশাহত হয়েছি। শুধু মনে হয়েছে এই সময়টাতে ক্যাম্পাসে থাকলে কি করতাম। শীতের সকালে শিশিরভেজা ঘাস, লাল অট্টালিকার মাঝে ফুলে ফুলে সাজানো পিচ ঢালা রাস্তার সৌন্দর্য দেখতাম অথচ কিছুই হয়নি। গ্রীষ্মকালে সমস্ত ফল ফলান্তে ভরপুর ক্যাম্পাসের আম,জাম,কাঠাল এবং সবচেয়ে সেরা লিচু বাগানগুলোকেও ছুঁয়ে দেখা হয়নি।

তারপর, জানা হয়নি কেমন আছে? ফিসারিজ ফ্যাকাল্টির বিকেলে আড্ডা দেওয়া পুকুর পাড়,এগ্রিকালচার ফ্যাকাল্টির রিসার্স ফার্মের মাঠে কি সরিষা ফুলে ভরেছে এবারো?
আর ডিভিএম ডিপার্টমেন্ট এর পাশে ক্যাম্পাসের উটপাখিগুলো কেমন আছে তারা? হাবিপ্রবি মজার ইস্কুলের ছোট ছোট বাচ্চারা কেমন আছে? তাঁরা কি পড়াশোনা খেলাধুলা করছে ঠিকমতো?

দূরে থেকেও এসব জানতে ইচ্ছে করেছে বারবার। এছাড়াও টিএসসি, ক্যাফেটেরিয়া এবং লাইব্রেরীর সামনে খোলা মাঠে বসে আড্ডাগুলো আবার কবে হবে। রাতের ক্যাম্পাস দেখা, টংয়ের দোকানে চায়ের আড্ডা, পা ঝুলিয়ে ভ্যানে করে ঢেপা নদী দেখতে যাওয়া, সকালে দেড়িতে উঠেও ক্লাসে যাওয়া, বৃষ্টিতে কাক ভেজা হয়ে ক্লাসে দৌড়ে উপস্থিত হওয়া, মাঝরাতে হলের ছাদে বসে গান বাজনা, ক্লাস, ল্যাব, এসাইনমেন্ট, প্র্যাকটিকাল, পরীক্ষার চাপ সব কিছুই যেন ২০২০ সালের অন্ধকারে ঢাকা পড়েছিল।

করোনাকালীন সময়ে এতোগুলো স্মৃতির মাঝেও ঘরে বসে কিছুটা স্বস্তি পেয়েছি। প্রথম দিকে একটু ভয় ভীতির সাথে কাটলেও তখন ঘরে বসে কিছু নতুন অভিজ্ঞতা যুক্ত হয়েছে। সামাজিক কাজে নিজেকে নিয়োজিত করা, অনলাইন কোর্স সম্পন্ন করে সার্টিফিকেট অর্জন, বিভিন্ন অনলাইন সেমিনার, কনটেষ্ট এ অংশগ্রহণ এবং পুরষ্কার প্রাপ্তি।

এছাড়াও বিভিন্ন লেখকের বই পড়া, মুভি দেখা, আঁকাআঁকি, লেখালেখিতে ব্যস্ত সময় ই পার করেছি। বিশেষ করে বিভিন্ন পত্রিকায় লেখা পাঠিয়েছি। নিজের লেখাগুলো ছাপার অক্ষরে দেখে উৎসাহ আর অনু্প্রেরনা পেয়েছি। পরবর্তিতে যদিও অনলাইনে ক্লাস শুরু হয়েছে। বন্ধু-বান্ধব, প্রিয় শিক্ষকদের ক্যামেরার সামনে দেখে ভালো লাগলেও আগের মতো মনের প্রশান্তি হয়নি। বার বার ফিরে যেতে ইচ্ছে করেছে সকলের মাঝে আগের মতো করে।

২০২০ সালের সুখ-দুঃখের নানান অভিজ্ঞতাকে আড়াল করে এখন ২০২১ কে স্বাগত জানানোর সময়। আশা করি ২০২০ সালের সকল প্রতিবন্ধকতাকে কাটিয়ে আমরা ২০২১ নতুন করে শুরু করতে পারবো। সেই সাথে আশার আলো করোনা মহামারীর ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে আমরাও পেয়ে যাবো অতি শীঘ্রই।

আবারো আমরা জীবনকে সুন্দরভাবে সাজাতে এগিয়ে যাবো। শিক্ষার্থীরা ফিরে যাবো চিরচেনা ক্যাম্পাসে সব কিছু ফিরে পাবো আগের মতো করে। একসাথে হেসে খেলে সময় কাটাবো সেই প্রত্যাশা ২০২১ সবার জীবনে নিয়ে আসুক সফলতার বার্তা।

লেখকঃ মো.সুমন সরকার
অর্থনীতি বিভাগ, হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, দিনাজপুর।

আলোকিত ভোর

প্রিয় পাঠক, আপনিও লিখতে পারেন আমাদের পোর্টালে। কোন ঘটনা, পারিপাশ্বিক অবস্থা, জনস্বার্থ, সমস্যা ও সম্ভাবনা, বিষয়-বৈচিত্র বা কারো সাফল্যের গল্প, কবিতা,উপন্যাস, ছবি, আঁকাআঁকি, মতামত, উপ-সম্পাদকীয়, দর্শনীয় স্থান, প্রিয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ফিচার, হাসির, মজার কিংবা মন খারাপ করা যেকোনো অভিজ্ঞতা লিখে পাঠান সর্বোচ্চ ৩০০ শব্দের মধ্যে। পাঠাতে পারেন ছবিও। মনে রাখবেন দৈনিক আলোকিত ভোর.কম পোর্টালটি সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন‌্য উন্মুক্ত। তাছাড়া, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার স্বাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবর অথবা লেখা মান সম্পন্ন এবং বস্তুনিষ্ঠ হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে। লেখা পাঠানোর ইমেইল- dailyalokitovor@gmail.com