বঙ্গবন্ধু ছিলেন বাঙালির পথ প্রদর্শক

প্রকাশিত: ১০:০০ অপরাহ্ণ , জানুয়ারি ৯, ২০২১

এস এম নূর উদ্দিনঃ আজ ১০ জানুয়ারি, বাংলার অবিসংবাদিত নেতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বদেশ প্রত্যাবর্তন দিবস। দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার, ১০জানুয়ারি, ১৯৭২ সালের এদিনে বেলা ১টা ৪১ মিনিটে জাতির অবিসংবাদিত নেতা, বাংলার মানুষের নয়নের-মনি মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দীর্ঘ ৯ মাস ১৪দিনের কারাভোগের পর পাকিস্তানের বন্দিত্ব থেকে মুক্তি পেয়ে যুদ্ধবিধ্বস্ত সদ্য স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখেছিলেন। সেই সাথে বাংলার আপামর জনতা পেয়েছিল মুক্তির পূর্ণ স্বাদ।

১৯৭০ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করলেও পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা হস্তান্তরে অনীহা প্রকাশের ফলে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলার মুক্তিকামী আপামর মানুষ অসহযোগ আন্দোলনের পথ বেচে নেয়। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী তাদের পূর্বপরিকল্পিত পরিকল্পনা অনুযায়ী ২৫ শে মার্চ কালোরাতে ঘুমন্ত নিরীহ বাঙালির ওপর নিধনযজ্ঞের নীলনকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়নের মাধ্যমে গণহত্যা চালায়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেন এবং সর্বস্তরের জনগণকে যার যা আছে তা নিয়েই মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ার আহ্বান জানান। এর কিছুক্ষণ পরেই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বঙ্গবন্ধুকে তাঁর ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাড়ি থেকে গ্রেপ্তার করে তদানীন্তন পশ্চিম পাকিস্তানের মিয়ানওয়ালি কারাগারে বন্দি করে রাখেন।

শুরু হয় বাঙালির সশন্ত্র মুক্তিযুদ্ধ। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চলতে থাকে। এ সময় বঙ্গবন্ধুকে পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি রেখে তার উপর নির্যাতন চালানো হয়। পাকিস্তানিরা বঙ্গবন্ধুকে হত্যা করার নানা পরিকল্পনা তৈরি করে। জেলের মধ্যে অত্যাচার নির্যাতনই শুধু নয়, তাকে ফাঁসির মঞ্চেও নিয়ে যাওয়া হয়। এমনকি কারাগারে কবরও তৈরি করা হয়। কিন্তু দেশে-বিদেশে বঙ্গবন্ধুর জনপ্রিয়তা ও তার অদম্য সাহসের কাছে শেষ পর্যন্ত হারমানে পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী এবং সেনাবাহিনী।

এদিকে বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতেই বাঙালি জাতি বঙ্গন্ধুর আদর্শে ও নির্দেশিত পথে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ চালিয়ে যায়। যতোদিন যেতে থাকে যত রক্ত ঝরতে থাকে, স্বদেশের মাটিকে হানাদার মুক্ত করতে বাঙালি ততোই মরিয়া হয়ে উঠে। মুক্তিবাহিনী এবং মিত্রবাহিনীর যৌথ প্রতিরোধের মুখে ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান হানাদার বাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়।

পাকিস্তানের আত্মসমর্পণের মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি বিজয় অর্জন করেন। মুক্তিযুদ্ধে ৩০ লাখ শহীদ হন ও ৩ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রম হারান। এতো রক্ত ও প্রাণের বিনিময়ে বিজয় এলেও মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কারাগারে বন্দি থাকায় বাঙালির অর্জিত বিজয় পূর্ণতা পায়নি। বিজয়ী বাঙালি জাতি উদ্বেগ-উৎকণ্ঠার মধ্য দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকে তাদের নেতার ফিরে আসার পথ চেয়ে।

মুক্তিযুদ্ধে বিজয় অর্জনের পর বিশ্বব্যাপী বঙ্গবন্ধু জনপ্রিয়তা আরও বাড়তে থাকে। বাঙালির পাশাপাশি বিশ্বের স্বাধীনতা ও শান্তিকামি মানুষও বঙ্গবন্ধুর মুক্তির দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠে। আন্তর্জাতিক চাপের কাছে নতিস্বীকার করে অবশেষে ১৯৭২ সালের ৮ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি শাসক গোষ্ঠী।

৮ জানুয়ারি কারাগার থেকে মুক্তির পর বঙ্গবন্ধু ও কামাল হোসেনকে লন্ডনের উদ্দেশ্যে বিমানে তুলে দেওয়া হয়। সকাল সাড়ে ৬ টায় তাঁরা পৌঁছান লন্ডনের হিথ্রো বিমানবন্দরে, ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ সেই দিন লন্ডনের বাইরে ছিলেন। তিনি সফর সংক্ষিপ্ত করে বঙ্গবন্ধুর জন্যই সন্ধ্যায় লন্ডনে ফিরে আসেন।

রাতে ১০নং ডাউনিং স্ট্রিটের দুয়ারে যখন বঙ্গবন্ধুকে বহনকারী গাড়ি থামল একটি লোক এসে গাড়ির দরজা খুললেন এবং বঙ্গবন্ধু বেরিয়ে না আসা পর্যন্ত দরজা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি আর কেউ নন, গ্রেট ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী এডওয়ার্ড হিথ। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এক ঘণ্টার বৈঠকে বঙ্গবন্ধু স্বাধীন রাষ্ট্র বাংলাদেশকে যুক্তরাজ্য কর্তৃক স্বীকৃতির বিষয়টি উত্থাপন করেন। পাকিস্তানে বন্দি অবস্থায় তার জীবন রক্ষার প্রচেষ্টার জন্য বঙ্গবন্ধু এডওয়ার্ড হিথকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করলেন। ৯ জানুয়ারি টেলিফোনে ইন্দিরা গান্ধী-বঙ্গবন্ধুর মধ্যে আধা ঘণ্টা আলোচনা হয়।

বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা যাওয়ার পথে দিল্লিতে যাত্রাবিরতির অনুরোধ করলেন। ইন্দিরা গান্ধী প্রথমে ভারতীয় বিমানের ব্যবস্থা করলেও হিথের পরামর্শে ব্রিটিশ এয়ারফোর্সের জেটে করেই বঙ্গবন্ধুকে ঢাকা পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। সাইপ্রাস ও ওমান হয়ে বিমান দিল্লিতে অবতরণ করলে প্রেসিডেন্ট শ্রী ভরাহগিরি ভেঙ্কটগিরি ও প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতী ইন্দিরা গান্ধী তাকে স্বাগত জানান। তখন রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় একুশবার তোপধ্বনি করা হয়। গার্ড অব অনার প্রদান ও ফুলের পাপড়ি বর্ষণ করা হয়।

দিল্লি হয়ে শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকা এসে পৌঁছেন ১০ জানুয়ারি। ১৬ ডিসেম্বর চূড়ান্ত বিজয়ের পর বাঙালি জাতি তাঁকে প্রাণঢালা সংবর্ধনা জানানোর জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় ছিল। আনন্দে আত্মহারা লাখ লাখ মানুষ ঢাকা বিমানবন্দর থেকে রেসকোর্স ময়দান পর্যন্ত তাঁকে স্বতঃস্ফূর্ত সংবর্ধনা জানান। বিকেল ৫টায় রেসকোর্স ময়দানে প্রায় ১০ লাখ লোকের উপস্থিতিতে তিনি ভাষণ দেন। সশ্রদ্ধ চিত্তে তিনি সবার ত্যাগের কথা স্মরণ করেন, সবাইকে দেশ গড়ার কাজে উদ্বুদ্ধ করেন।

১২ জানুয়ারি বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন। ২৩ সদস্যের আওয়ামী লীগের মন্ত্রিসভা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বভার গ্রহণ করে।

বাঙালির এই মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে জাতির পিতার প্রত্যাবর্তনের এই দিনটি বিশেষ তাৎপর্য বহন করে কেননা বঙ্গবন্ধুর মুক্তি বিহীন স্বাধীনতার সুমিষ্ট স্বাদ হয়ত আবারও পরাধীনতার তিক্ততা গ্রাস করত। ৯ মাসের সশস্ত্র ও রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধে দেশ স্বাধীন হলেও প্রকৃতঅর্থে দেশে ফিরে আসার মধ্য দিয়েই বাঙালির বিজয় পরিপূর্ণতার তৃপ্তি ভোগ করে। জাতির পিতা নিজেই তার এ স্বদেশ প্রত্যাবর্তনকে আখ্যায়িত করেছিলেন ‘অন্ধকার হতে আলোর পথে যাত্রা’ (A Journey from darkness to light) হিসেবে।

লেখক : এস এম নূর উদ্দিন
শিক্ষার্থী, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

আলোকিত ভোর

প্রিয় পাঠক, আপনিও লিখতে পারেন আমাদের পোর্টালে। কোন ঘটনা, পারিপাশ্বিক অবস্থা, জনস্বার্থ, সমস্যা ও সম্ভাবনা, বিষয়-বৈচিত্র বা কারো সাফল্যের গল্প, কবিতা,উপন্যাস, ছবি, আঁকাআঁকি, মতামত, উপ-সম্পাদকীয়, দর্শনীয় স্থান, প্রিয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ফিচার, হাসির, মজার কিংবা মন খারাপ করা যেকোনো অভিজ্ঞতা লিখে পাঠান সর্বোচ্চ ৩০০ শব্দের মধ্যে। পাঠাতে পারেন ছবিও। মনে রাখবেন দৈনিক আলোকিত ভোর.কম পোর্টালটি সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন‌্য উন্মুক্ত। তাছাড়া, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার স্বাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবর অথবা লেখা মান সম্পন্ন এবং বস্তুনিষ্ঠ হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে। লেখা পাঠানোর ইমেইল- dailyalokitovor@gmail.com