বিয়োগ কেন হাসির যোগ?

প্রকাশিত: ৪:২১ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ২৭, ২০২১

বিয়োগ কেন হাসির যোগ?

খাইরুল ইসলাম দুখু: পৃথিবীর নিয়ম অনুযায়ী প্রতিদিনই চন্দ্র,সূর্যের মতই চিরসত্য মৃত্যু।

 

বিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রাবন্ধিক ও কবি প্রমথ চৌধুরী তার বীরবলের হালখাতা নামক প্রবন্ধে লিখেছিলেন, “মৃত্যু আছে বলেই বেঁচে স্বাদ।” কিন্তু সব মৃত্যু কাম্য নয়। কেউ কি চায় যে এমন মৃত্যু হোক?

 

যে মৃত্যুতে থাকবে না প্রিয়জনের সরব উপস্থিতি। যেই মৃত্যু ছিন্ন রাখে সন্তানকে মা-বাবার কাছ থেকে। এমন মৃত্যু কখনোই কাম্য নয়।

 

আমরা মানুষ; সৃষ্টির সেরা ও সামাজিক জীব হিসেবে পরিচিত। ক্ষণকালের অস্তিত্ব জানান দিতে অপ্রতিরোধ্য গতিতে আমরা প্রতিনিয়ত প্রতিদ্বন্দ্বিতায় লিপ্ত হই। তবে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতায় কেউ জয়ী। আবার কেউ পরাজয়ী।

 

কিন্তু দিনশেষে জীবন সংসারের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এটা চিরস্থায়ী সত্য যে, আমরা সবাই মৃত্যুর কাছে পরাজিত।

 

মৃত্যুর কাছে জয়ী বা মৃত্যুঞ্জয় কথাটি শোনা গেলেও, তা শুধুই বিমূর্ত একটা বিষয় বা ধারণা মাত্র। অর্থাৎ মৃত্যু নামক এই অমোঘ চিরসত্যকে অস্বীকার করার সাধ্য বা সাহস কারো নেই।

 

২০২০ সালের প্রথম থেকে এ অব্দি সবচেয়ে বেদনাদায়ক ঘটনা এই যে বছরজুড়ে আমাদের প্রতিটি সকাল শুরু হয়েছে, এতজন সংক্রমিত, এত জন সুস্থ ও কতজনের মৃত্যু এই খবর দিয়ে।

 

অর্থাৎ কোনো না কোনো মৃত্যুর খবর দিয়েই দিনের শুরু। সারা বিশ্বে এই শতাব্দীর আতঙ্ক ও আলোচিত নাম “করোনা ভাইরাস”। ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর চীনে প্রথম শনাক্তের পর ২০২০ সালের মার্চের ৮ তারিখে বাংলাদেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয়।

 

প্রথম মৃত্যু হয় ১৮ ই মার্চ। এখন পর্যন্ত এই মহামারীর ভয়াল থাবা ও এর বাইরেও ২০২০ ও ২০২১ সালের মধ্যে প্রাণ গেছে বাংলাদেশের অনেক অকুতোভয় বুদ্ধিজীবী সৈনিকের।

 

বর্তমানেও কমেনি এর তাণ্ডব। ভয়াল রুপ ধারণ করেছে আরও। এরপর ২০২০ থেকে শুরু করে অনেক প্রাতিশযশা বরেণ্য ব্যক্তিত্বের অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে ছিল শোকের ছায়া।

 

তার মধ্যে অন্যতম কয়েকজন বাংলাদেশ সরকারের সাবেক স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান, সাবেক বিসিবির পরিচালক এম.এ গফুর, সাংবাদিক কামাল লোহানী, বর্তমান সরকারের ধর্মমন্ত্রী আবদুল্লাহ ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা এইচ টি ইমাম, অভিনেতা এটিএম শামসুজ্জামান, অভিনেত্রী কবরী সারোয়ারসহ আরও অনেক সৃজনশীল ব্যক্তিত্ব ও বুদ্ধিজীবী।

 

আবার গত কয়েকদিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যে বিষয়গুলো সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ছে– তার মধ্যে মৃত্যুর খবরগুলো মানুষকে পীড়া দিচ্ছে প্রতিনিয়ত। প্রতিনিয়ত অপ্রত্যাশিত ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে মৃত্যু বাড়ছে।

 

কমছে অমূল্য ও অন্যতম দরকারী মূলধন আমাদের মানবসম্পদ। বাড়ছে সমগ্র দেশে সৃজনশীলতা ও সৃজনশীল মানুষ হারানোর হাহাকার ।

 

জাতি হারাচ্ছে তার চিন্তাশীল কিছু সৃজনশীল ও মননশীল ব্যক্তিত্বকে। গত ক’দিন আগে করোনা সহ আরেকটি বিষয় যেটা আলোচনার শীর্ষে ছিল

 

তা হলো–স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদযাপন উপলক্ষ্যে ক্ষমতাসীন দল কর্তৃক আমন্ত্রিত অতিথি মোদী আসাকে কেন্দ্র করে হেফাজতে ইসলামের ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিতে প্রায় ১৭ জনের মৃত্যুর বিষয়টি।

 

আবার অশ্রুসিক্ত চোখ আটকে যাওয়ার মত শিরোনাম দেখেছি “সকালে সদ্য জন্ম দেওয়া মায়ের বিকেলে মৃত্যু”। একাত্তর টিভির সংবাদ প্রযোজকের এমন মৃত্যুও ভাবিয়েছে সবাইকে।

 

করোনায় চিত্রনায়িকা কবরী সারোয়ার ও অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইতিহাস, রাজনীতি ও পররাষ্ট্রনীতি বিশ্লেষক তারেক শামসুর রেহমান এর মৃত্যুতে নেমে আসে শোকের ছায়া।

 

সর্বশেষ বাঁশখালীতে শ্রমিকদের দাবি আদায়ের বিক্ষোভ চললে সেখানে পুলিশ কর্তৃক গুলিতে ৫ জনের মৃত্যু ।

 

এই মৃত্যুগুলোও কাম্য নয়। যেকোনো মৃত্যুই শোকের ও বিয়োগের। বিয়োগান্তক ঘটনায় সকল শোক মৃত্যুর না হলেও সকল মৃত্যুই কিন্তু শোকের। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম;

 

বিশেষত ফেসবুক ও ইউটিউবের মত পাবলিক প্লাটফর্মে অনেকের মন্তব্য। সেখানে শুধু ধর্ম, আদর্শ, রাজনৈতিকভাবে পার্থক্য থাকায় মৃত্যুর সংবাদেও বিভিন্ন কায়দায় সন্তষ্টি বাক্য উচ্চারণ করেছে।

 

কতটা বিকৃত মস্তিষ্কের ও বেপোরোয়া হলে তবেই একজন মানুষ অন্য আরেকজনের মৃত্যুতে শোকাহতের বিপরীতে খুশি হয়ে সন্তষ্টবাক্য উচ্চারণ করতে পারে।

 

মৃত ব্যক্তিটি যেই মতাদর্শের হোক না কেন এমন সংকীর্ণ ও বিকৃত সংস্কৃতি মোটেও কাম্য নয়। এই অসুস্থ সংস্কৃতির শুরু ক’দিনেই তৈরি হয়নি। এর আগেও দেখেছি। ২০১৩ সালের পরে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের পর ফাঁসি কার্যকরসহ বিভিন্ন কারণে ভিন্ন মতাদর্শের কেউ মারা গেলেও আনন্দ মিছিল ও বিভিন্ন জায়গায় আনন্দ উদযাপন।

 

কিন্তু বিচারিক কার্যক্রমে রায় নিয়ে সন্তষ্ট থাকায় শ্রেয় ছিল । মৃত্যু মৃত্যুই। কোনো মৃত্যুতেই আনন্দ উদযাপন শ্রেয় বা শোভনীয় নয়। সে যেই দল,মত ও ধর্মেরই হোক না কেন। জাতি হিসেবে না ধরলেও মানবজাতির কাছে এই সংস্কৃতি বড্ড বেমানান।

 

মোটের ওপর মৃত্যু নিয়ে সম্প্রতি আমাদের দেশে যে সংস্কৃতি চালু হয়েছে। তা মোটেও কাম্য নয়। সব মৃত্যুই শোকের। অনাকাঙ্ক্ষিত বা অপ্রত্যাশিত মৃত্যুতে ব্যথিত হওয়াটায় বিবেকবোধ ও মানবতার জায়গা থেকে শোভনীয় ও কাম্য।

 

তাই এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে মানুষ হিসেবে উচিত হবে ব্যথিত হওয়া,শোকাহত বা চুপ থাকা। তাই কোনো মানুষের বিয়োগে হাসিরঠাট্টার যোগে মস্তিস্কের বিকৃতি না ঘটিয়ে

 

আমাদের উচিত হবে– সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে বিবেকবোধ ও সুস্থ মস্তিষ্কের চিন্তা নিয়ে মানুষ হিসেবে অন্যের সুখ ও দুঃখের অংশীদার হয়ে, স্বগৌরবে মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকা।

 

লেখক : শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ,রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

ফেসবুকে আমরা

পুরাতন সব সংবাদ

শনি রবি সোম মঙ্গল বুধ বৃহ শুক্র
১০১১১২১৩১৪
১৫১৬১৭১৮১৯২০২১
২২২৩২৪২৫২৬২৭২৮
২৯৩০৩১  
এই মাত্র পাওয়া