টপ নিউজমতামত

রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রতিচ্ছবি এখন সু চি

আনিস আলমগীর: আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে সু চি’কে দেশের প্রতিনিধিত্ব করতে পাঠানোটি মিয়ানমারের জন্য বুমেরাং হয়েছে। সু চি’কে জুয়ার বড় দান হিসেবে খেলতে গিয়ে সামরিক জান্তা তাকে বানিয়ে দিয়েছে গণহত্যার ‘পোস্টার চাইল্ড’। রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রতিবাদ-সমাবেশে সু চি’র ছবিই ব্যবহৃত হয়েছে গত সপ্তাহ জুড়ে। সুতরাং সু চি’র হেগ যাত্রায় এ পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী যে প্রতিক্রিয়া হয়েছে তার বিচার করে এই কথা বলাটা অমূলক নয় যে, এটি কেবল সু চি’র দুর্বল পরিচালনাই নয়, তার যেটুকু নৈতিক বৈধতা অবশিষ্ট ছিল সেটাও দ্রুত হাওয়া হয়ে যাবে।
সু চি’র কাহিনি সিনেমাকেও হার মানায়। আজ থেকে ২৮ বছর আগে ১৯৯১ সালের ১০ ডিসেম্বর নরওয়ের অসলোতে তাকে তার অনুপস্থিতিতে শান্তিতে নোবেল পুরস্কার দিয়েছিল নোবেল কমিটি। তার পক্ষে তার ১৮ বছরের ছেলে আলেকজান্ডার আরিস সেখানে বক্তৃতা দিয়েছেন। তুলে ধরেছেন মিয়ানমারের সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে তার মা অং সান সু চি’র লড়াইয়ের কাহিনি। ঠিক একই তারিখ ১০ ডিসেম্বর ২০১৯ নেদারল্যান্ডসের হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে এলেন সু চি, মিয়ানমারের সেই নিকৃষ্ট সেনাবাহিনীর পক্ষে সাফাই গাইতে, যখন গাম্বিয়া মিয়ানমারের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগ আনলো রোহিঙ্গা গণহত্যার।

নব্বই দশকে আমরা কেউ কি স্বপ্নেও কল্পনা করতে পেরেছি– নোবেল শান্তি পুরষ্কার বিজয়ী অং সান সু চি আন্তর্জাতিক বিচার আদালতে (আইসিজে) গণহত্যার জন্য বিচারের মুখোমুখি হবেন? এর চেয়েও অবাক করা বিষয়টি হলো তিনি তাদের পক্ষে সাফাই গাইলেন যারা তাকে পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে গৃহবন্দী করে রেখেছিল। আইসিজে’র ইতিহাসে এটি একেবারেই অস্বাভাবিক ঘটনা, বিচারকরা তাকে ভালোভাবে গ্রহণ করতে পারবেন না।

রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে গণহত্যা চালানো অপরাধ প্রকাশ্যে স্বীকার করে নিতে অং সান সু চি’র প্রতি আহ্বান জানিয়েছিল সাতজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। সু চি’কে মিথ্যাচার থেকে বিরত থেকে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নিতে বলেছিলেন তারা। কিন্তু তিনি তাদের কথায় কর্ণপাত করেননি। বরং তার সঙ্গে মিয়ানমারের সামরিক জান্তার পক্ষ অবলম্বন করে দৃঢ়ভাবে তাদের কর্মকাণ্ডকে ডিফেন্ড করে গেলেন।

এলেন ক্লেমেন্সের সঙ্গে সু চি’র সাক্ষাৎকার ভিত্তিক ‘দ্য ভয়েস অব হোপ’ বইতে সু চি বলেছেন, ‘কেউ আপনাকে অপমান করতে পারে না আপনি ছাড়া’। আজ বার্মিজ সামরিক জান্তার হত্যা, ধর্ষণের পক্ষে সাফাই গেয়ে সু চি শুধু নিজেকে নয়, অপমান করেছেন তাকে যারা নোবেল দিয়েছে সেই কমিটিকে। সু চি অপমান করেছেন সারা বিশ্বের সেইসব মানুষদের যারা তার জান্তা বিরোধী সংগ্রামে তার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল।

১৯৮৮ সালে সু চি বার্মা এসেছিলেন তার অসুস্থ মাকে দেখার জন্য। এসে তিনি রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়লেন। ১৯৮৯ সাল থেকে তিনি ৫০, ইউনিভার্সিটি এভিনিউতে তার পৈতৃক বাড়িতে সুদীর্ঘ সময় গৃহবন্দি ছিলেন। সামরিক জান্তা তার খোরাকির টাকাও দিতো না। শেষের দিকে তিনি বাড়ি বিক্রি করে খোরাকির ব্যবস্থা করেছিলেন। বন্দি অবস্থায় তার প্রিয়তম স্বামীর মৃত্যু হয়। তিনি তাকে শেষ বিদায় পর্যন্ত জানাতে পারেননি। লন্ডনে তার দুই সন্তান পিতা-মাতার স্নেহ বঞ্চিত হয়ে বড় হয়েছেন। সামরিক জান্তার এমন নিষ্ঠুর আচরণের কথা বিস্মৃত হয়ে তিনি হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে এলেন পাপিষ্ট সামরিক জান্তার পক্ষে সাফাই গাইতে! সমগ্র বিবেকসম্পন্ন দুনিয়া তার তৎপরতার নিন্দা জানিয়েছে।

সু চি হেগে আসায় অবশ্য একটি প্রধান কাজ হয়েছে। যেটা দিয়ে শুরু করেছিলাম এই লেখা। মিডিয়ার দৃষ্টি পড়েছে তার ওপর। মিয়ানমারে সেনাদের হাতে রোহিঙ্গা নির্যাতনের বিষয়টি সবার জানা ছিল। কিন্তু সু চি’র সাফাই তাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। সু চি কত বড় মিথ্যাবাদী বিশ্ব মিডিয়া এর মাধ্যমে দেখল। রোহিঙ্গা গণহত্যার জন্য মিয়ানমারের জান্তা এতদিন চিহ্নিত হতো। সু চি হেগে সাফাই দিতে গিয়ে নিজেই এখন রোহিঙ্গা গণহত্যার ‘পোস্টার চাইল্ড’ বা প্রতিচ্ছবি হয়ে গেছেন। তিনিই এখন বিশ্বজুড়ে মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যার প্রতিচ্ছবি হিসেবে প্রতিনিধিত্ব করছেন, সামরিক জান্তা একা নন।

গাম্বিয়ার পক্ষে আদালতে বক্তব্য উপস্থাপন করেন গাম্বিয়ার বিচার দফতরের মন্ত্রী আবুবকর মারি তাম্বাদো। তিনি অন্যান্য উকিল নিয়ে আদালতে উপস্থিত ছিলেন এবং ১০ ডিসেম্বর তার বক্তব্য পেশ করেন। আবুবকর মারি তাম্বাদো রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর ছিলেন। তখন থেকে গণহত্যা বিষয়ক অন্যান্য খ্যাতিমান আইনজীবীদের সঙ্গে তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। অনেকের আশ্বাসের ওপর নির্ভর করে গাম্বিয়ার বিচারমন্ত্রী মামলা নিয়ে আন্তর্জাতিক আদালতে উপস্থিত রয়েছেন। অর্থ সরবরাহের সুনির্দিষ্ট আশ্বাস রয়েছে ওআইসির তরফ থেকে। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সহযোগিতা গাম্বিয়ার জন্য খোলা তো থাকবেই।

হেগের আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারের পক্ষে মুখ্য ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিলেন সে দেশের কাউন্সিলর ও ডি ফ্যাক্টো সরকার প্রধান অং সান সু চি। তার সহযোগী আরও কয়েকজন আইনজ্ঞ উপস্থিত ছিলেন। সু চি’র উপস্থিতি এবং তার বক্তব্য নিশ্চয়ই আন্তর্জাতিক আদালত সরকারের বক্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে কোনও দ্বিধা দ্বন্দ্বের কথা নয়। ১১ ডিসেম্বর অং সান সু চি তার বক্তব্য আদালতে পেশ করেছেন।

উভয় পক্ষ বহু কথা আদালতে বলেছেন। সব কথা লিখতে গেলে লেখা দীর্ঘ হবে। সুতরাং সার নির্জাস নিয়ে কথা বলাই উত্তম হবে মনে করছি। ২০১৭ সালে বৌদ্ধ সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশটিতে সেনা অভিযানের সময় হাজার হাজার রোহিঙ্গা নিহত হয়েছিল। ৭ লাখের বেশি রোহিঙ্গা তখন প্রতিবেশী বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছিল। গাম্বিয়ার অভিযোগ, হত্যা, শিশু হত্যা, ধর্ষণ, অগ্নিসংযোগ, গণউচ্ছেদের পাশাপাশি সামগ্রিক বিষয়টিতে গণহত্যার উদ্দেশ্য নিহিত ছিল বলে স্পষ্ট প্রতীয়মান হয়। গাম্বিয়া বলেছে, গণহত্যা এখনও চলমান। তাই গাম্বিয়া গণহত্যা বন্ধের জন্য প্রয়োজনীয় অন্তবর্তীকালীন নির্দেশ প্রার্থনা করেছে আন্তর্জাতিক আদালতের কাছে।

রোহিঙ্গারা খুবই হুমকির মুখে আছে। সুতরাং আদালত বিষয়টি জরুরি ভিত্তিতে বিবেচনা করবে বলে অনেকেই প্রত্যাশা করছেন। ১০ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আসলেও এখনও ছয় লাখ রোহিঙ্গা রাখাইনে রয়েছে। মিয়ানমারের ১৩৫টি উপজাতি রয়েছে। শুধু রোহিঙ্গাদের সঙ্গে নয়, প্রতিটি উপজাতির সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক খুবই খারাপ। এই ১৩৫টি উপজাতির সঙ্গে বার্মা জেনোসাইড কনভেনশন লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

আদালতের শুনানিতে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে বলতে গিয়ে অং সান সু চি একবারের জন্যও রোহিঙ্গা নামটি উচ্চারণ করেননি। তিনি আগে থেকেই রোহিঙ্গা শব্দটি ব্যবহার না করার পরামর্শ দিয়েছেন তার মন্ত্রী-আমলাদের। রোহিঙ্গা শব্দটার প্রতি তার বিদ্বেষের কারণে এটা সুস্পষ্টভাবে বুঝা যায় যে রোহিঙ্গাদের সম্পর্কে মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একটি বিরোধী এবং বিদ্বেষপ্রসূত অবস্থান রয়েছে। অং সান সু চি বলেছেন, বিদ্রোহী গোষ্ঠীর সঙ্গে সেনাবাহিনীর সংঘাতে কিছু বাড়াবাড়ি হয়েছে যে কারণে রোহিঙ্গারা দেশত্যাগ করছে। তিনি বলেছেন, সেনাবাহিনীর বাড়াবাড়ি বিষয়ে এখন অভ্যন্তরীণ বিচার ব্যবস্থায় তাদের বিচার চলছে।

যাহোক, রোহিঙ্গাদের জন্য ভালো যে উদ্বোধনী শুনানি পর্বে সু চি এবং মিয়ানমারের অবস্থান খুবই দুর্বল হয়েছে। শুনানিতে তাদের যুক্তিগুলোর দুর্বলতা প্রকট হয়ে প্রকাশিত হয়েছে। মনে হচ্ছে গাম্বিয়া জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ গ্রহণের যে আবেদন জানিয়েছে অনুরূপ কিছু গাম্বিয়া প্রত্যাশা করতে পারে।

কানাডা সরাসরি বলেছে যে মিয়ানমারের সামরিক বাহিনী রোহিঙ্গা জেনোসাইডের সঙ্গে জড়িত। মিয়ানমারের প্রতি রাশিয়া, চীন, জাপান এবং ভারতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সমর্থনের কারণে বাংলাদেশে প্রাথমিকভাবে একটা দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সম্পাদনের পরেও সমস্যার কোনও সুরাহা করতে পারছে না। কারণ মিয়ানমারের সমস্যা সমাধানের আগ্রহ নেই। আন্তর্জাতিক আদালত ভিন্ন অন্য কোনোভাবে তাকে সমাধানের পথে আনা সম্ভব নয়। সুতরাং কানাডাকে একটা গণহত্যার মামলা করার জন্য আমরা অনুরোধ করবো। অমুসলিম দেশগুলোরও উচিত নতুন মামলা করা।

অধ্যাপক ফ্রেডরিক জন প্যাকার কানাডার অটোয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের হিউম্যান রাইটস রিসার্চ ও এডুকেশন সেন্টারের পরিচালক এবং আইন অনুষদে ইন্টারন্যাশনাল কনফ্লিক্ট রেজল্যুশনের অধ্যাপক। এই বিষয়ে তিনি বলেছেন, বাংলাদেশ এবং মালয়েশিয়া যৌথভাবে বা পৃথকভাবে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে মামলা করলে কম্পেন্সেশনের প্রশ্ন উত্থাপিত হবে। মালয়েশিয়া এবং বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের নিয়ে ভুক্তভোগী। কারণ বাংলাদেশ ১০ লাখ এবং মালয়েশিয়া লক্ষাধিক রোহিঙ্গা রয়েছে।

তার পরামর্শ অনুসারে বাংলাদেশ আর মালয়েশিয়া মামলার উদ্যোগ নেওয়া মনে হয় উত্তম হবে। আন্তর্জাতিক আদালত ভিন্ন অন্য কোনও পথে মিয়ানমারকে সোজা পথে আনা সম্ভব নয়। সুতরাং বাংলাদেশ সরকার বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দিয়ে মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করা উত্তম হবে বলে মনে হচ্ছে।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট, ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

Tags

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close