বিলুপ্ত প্রজাতির লজ্জাবতী বানর এখন মধুপুর জাতীয় উদ্যানে

প্রকাশিত: ৬:৪৭ অপরাহ্ণ , ফেব্রুয়ারি ১৪, ২০২১

মধুপুর প্রতিনিধি:

সিলেট ও চট্টগ্রামের চিরহরিৎ বনের বিলু প্রজাতির লজ্জাবতী বানর এখন টাঙ্গাইলের মধুপুর জাতীয় উদ্যানে বিচরণ করছে। পত্রঝরা গজারি বা শালবনে এর অস্তিুত্ব মেলায় বন্যপ্রাণী বিশারদরা বিস্ময় প্রকাশ করেছেন।

বুধবার (২১ অক্টোবর) মধুপুর জাতীয় সদর উদ্যান রেঞ্জের লহুরিয়া বিটের গভীর জঙ্গলে এক সৌখিন ভিডিওগ্রাফারের ক্যামেরায় ধরা পড়ে মহাবিপন্ন তালিকার এ প্রাণীটি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এটির সচিত্র খবর ভাইরাল হয়ে যায়।

মধুপুর পৌরশহরে সৌখিন ভিডিওগ্রাফার আব্দুর রহমান রুপম জানান, নিজস্ব অনলাইন চ্যানেল ‘ভয়েস অব মধুপুর ’ এ প্রচারে জন্য বানর ও হনুমানের ওপর একটি ডকুমেন্টেশন নির্মাণ করছেন তিনি।

এ ডকুমেন্টশনের জন্য বনের বিভিন্ন চিত্র ধারণ করার সময় ওই বনবিটের বাঁশঝাড়ে লজ্জাবতী বানরকে দেখতে পাওয়া যায়। খবর পেয়ে স্থানীয় বনকর্মীরাও সেখানে হাজির হন।

তারা বিরল প্রজাতির এ বন্য প্রাণী অবলোকন করে বিস্মিত হন।
দোখলা রেঞ্জ অফিসার আব্দুল আহাদ জানান, মধুপুর বনাঞ্চলে হরিণ, বাঘডাসা, বনবিড়াল, খরগোশ, বনমুরগি, বানর, হনুমানসহ নানা প্রজাতির বন্যপ্রাণী দেখা হলেও কখনো লজ্জাবতী বানরের দেখা মেলেনি।

মধুপুরের পাহাড়জুড়ে এখন কলা চাষ হয়। অনেক সময় খাদ্য সংকট হলে ক্ষুধার্ত বানর ও হনুমান খাবারের লোভে কলার ট্রাকে চড়ে বসে। সেসব ট্রাক কলার চালান নিয়ে দেশের বিভিন্ন স্থানে গিয়ে থাকে। এভাবে কলার ট্রাকের সাথে বানর হনুমান বিভিন্ন স্থানে হিজরত করে।

একইভাবে হয়তো সিলেট থেকে কোন অনাহারী লজ্জাবতী বানর ট্রাকে চড়ে মধুপুর এসেছে। তারপর কোন না কোনভাবে সে মধুপুরের গজারি বনে আশ্রয় নিয়েছে। কারণ লজ্জাবতী বানর শালবনের প্রাণী নয়।

তরুণ বন্যপ্রাণী গবেষক এবং আইইউসিএনের বানর বিশেষজ্ঞদলের সদস্য তানভীর আহমেদ জানান, বিশ্বে প্রাইমেট বর্গের ৭৯ গোত্রের ৫০৪ প্রজাতির বানর রয়েছে। তবে বাংলাদেশে রয়েছে ১০ প্রজাতির বানর-হনুমান। এর ৬ প্রজাতি বিপদগ্রস্থ তালিকার। আর লরিসিডি পরিবারের লজ্জাবতী বানর মহাসংকটাপন্ন। এটি নিশাচর ও লাজুক স্বভাবের। লাজুক স্বভাবের বলে এর নাম লজ্জাবতী বানর।

এটি সাধারণত দৈর্ঘ্যে ২৬ থেকে ৩৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ১ থেকে ২ কেজির হয়ে থাকে। এর মাথা গোলাকার, মুখ চ্যাপ্টা, মায়াবী চোখ দুটো বেশ বড়। তবে কান ও লেজ ছোট। শরীর ঘন ময়লাটে সাদা-বাদামী লোমে ঢাকা। মাথার ওপর হতে গাঢ় রংয়ের দাগ পিঠ বেয়ে নিচে নেমে গেছে। এরা একাকী এবং নীরবে থাকতে পছন্দ করে।

সারা দিন গাছের উঁচু কোটরে অথবা পাতা ভরা ঘন ডালের আঁধারে ঘুমিয়ে কাটায়। সন্ধ্যার পর একা বা জোড়ায় খাবারের সন্ধানে নামে। এরা বাঁচে বড়জোর ২০ বছর। বছরে একবার একটি মাত্র বাচ্চা প্রসব করে। চিরসবুজ ও বৃষ্টিপাতপূর্ণ ঘন বন বা বাঁশঝাড় এদের খুব পছন্দ।

বর্তমানে সিলেটের শ্রীমঙ্গলের বনাঞ্চলে এদের দেখা মেলে। দশ বছর আগে চট্টগ্রামের বনাঞ্চলে এদের দেখা গেছে বলে চট্টগ্রাম বনগবেষণা কেন্দ্র দাবি করেন।বানর বিশেষজ্ঞরা জানান, পোকামাকড়, ছোটফলমূল, গাছের নরম বাকল এবং জিগার আঠালো খাবার এদের খুব পছন্দের।

ফুলফলের পরাগায়নে এদের বড় ভূমিকা রয়েছে। বিগত দুই দশকে এদের সংখ্যা অর্ধেকে নেমেছে। দেখতে খুব সুন্দর বলে আন্তর্জাতিক চোরাবাজারে এর চাহিদা বেশি।

বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মিয়ানমার, চীন, কম্পোডিয়া, লাওস, থাইল্যান্ড ও ভিয়েতনামে এদের দেখতে পাওয়াযায় । লজ্জাবতী বানরের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এরা বিষাক্ত প্রাণী। এরা রেগে গেলে আত্মরক্ষার জন্য গ্রন্থিথলি থেকে মুখে বিষ আনে এবং শত্রুকে কামড়ে দেয়। এর কামড়ে বিষাক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা ব্যয়বহুল।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এবং বানরবিদ ড.ফরিদ আহসান ১৯৭৯ থেকে ৮১ সাল পর্যন্ত লজ্জাবতী বানর নিয়ে গবেষণা করেন। ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত তার গবেষণা পত্র থেকে দেখা যায়, ময়মনসিংহ বনবিভাগের শেরপুরের বালিজুড়ি রেঞ্জের গজারি বনে লজ্জাবতী বানর রয়েছে।

কিন্তু ২০১০ সালে এখানকার বন লজ্জাবতী বানর শূন্য হয়ে যায় বলে এক বন বিভাগীয় রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।সাবেক বিভাগীয় বনকর্মকর্তা শামসুল হক জানান, ব্যাপকহারে প্রাকৃতিক বন উজাড়, খাদ্যাভাব, আবাসস্থল ধ্বংস, অবৈধ শিকার, বিদেশি গাছের বনায়ন এবং বনভূমি জবরদখলের ফলে লজ্জাবতী বানরসহ বহু প্রজাতির বন্যপ্রাণী বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে।

মধুপুর বনাঞ্চলের সহকারী বন সংরক্ষক জানান, বছর দেড়েক যাবৎ এ লজ্জাবতী বানরটি মধুপুর বনে ঘুরেফিরে বেড়াচ্ছে। অতিথি হিসাবে এর আগমন। ঠিক কখন, কিভাবে এটি মধুপুর উদ্যানে এসেছে তা বলা যাচ্ছেনা।

টাঙ্গাইল বিভাগীয় বন কর্মকর্তা জহিরুল হক জানান, মধুপুর বনাঞ্চলে লজ্জাবতী বানরের বসবাসের কোন ইতিহাস নেই। এটি পুরোটাই চিরহরিৎ বনের প্রাণী। শুস্ক মৌসুমে মধুপুর বনাঞ্চল পাতাশূণ্য হয়ে গেলে সাধারণ বানর-হনুমানের তখন খাবার সংকট চলে। এখানে লজ্জাবতী বানরের টিকে থাকা খুবই কঠিন।

প্রিয় পাঠক, আপনিও লিখতে পারেন আমাদের পোর্টালে। কোন ঘটনা, পারিপাশ্বিক অবস্থা, জনস্বার্থ, সমস্যা ও সম্ভাবনা, বিষয়-বৈচিত্র বা কারো সাফল্যের গল্প, কবিতা,উপন্যাস, ছবি, আঁকাআঁকি, মতামত, উপ-সম্পাদকীয়, দর্শনীয় স্থান, প্রিয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ফিচার, হাসির, মজার কিংবা মন খারাপ করা যেকোনো অভিজ্ঞতা লিখে পাঠান সর্বোচ্চ ৩০০ শব্দের মধ্যে। পাঠাতে পারেন ছবিও। মনে রাখবেন দৈনিক আলোকিত ভোর.কম পোর্টালটি সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন‌্য উন্মুক্ত। তাছাড়া, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার স্বাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবর অথবা লেখা মান সম্পন্ন এবং বস্তুনিষ্ঠ হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে। লেখা পাঠানোর ইমেইল- dailyalokitovor@gmail.com