কওমি শিক্ষা: উর্দু-ফার্সিতে জোর, বাংলায় গা ছাড়া

প্রকাশিত: ৬:৪১ অপরাহ্ণ , ফেব্রুয়ারি ২২, ২০২১

বিশেষ প্রতিবেদক: মাতৃভাষা বাংলা একেবারেই উপেক্ষিত কওমি শিক্ষায়। আরবির সংগে পাল্লা দিয়ে চলছে উর্দু এবং ফার্সিতে পাঠদান। সপ্তম শ্রেণির পর থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত নেই কোনো বাংলা বই। ইতিহাস-ঐতিহ্য এবং ভাষা আন্দোলনের গৌরব নিয়েও পাঠ্যপুস্তকে নেই কোনো অধ্যায়। কওমি থেকে শিক্ষা জীবন শেষ করা শিক্ষার্থীরা বলছেন, বড় ধরনের সংস্কার জরুরি পাঠ্যসূচিতে। উর্দুর আধিপত্যের ঘোর বিরোধীও কেউ কেউ।

অন্যদিকে মাদ্রাসা নিয়ন্ত্রণকারী আলেমদের মধ্যে রয়েছে ভিন্নমত। একাংশ চলতে চান আদি নিয়মেই। অন্যপক্ষ অবশ্য বলছেন, ধীরে ধীরে কওমি শিক্ষায় বাংলার উপস্থিতি বাড়াতে চান তাঁরা।

সংখ্যাগরিষ্ঠ কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষা শুরু হয় উর্দুখানা এবং ফার্সিখানার মাধ্যমে। যেখানে রাতদিন এই দুই ভাষা শেখানোতেই ব্যস্ত থাকেন শিক্ষকরা। কওমি মাদ্রাসার বৃহত্তম বোর্ড বেফাকুল মাদারিসিল বাংলাদেশ- বেফাক।

বেফাকের প্রণীত সিলেবাসই অন্যরা অনুসরণ করেন। সরকারি স্বীকৃতি নিতে গঠিত সম্মিলিত কওমি মাদরসা শিক্ষা সংস্থা ‘আল হাইআতুল উলয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশ’-এর মূল দায়িত্বেও এই বোর্ডের দায়িত্বশীলরা থাকেন পদাধিকারবলে। সবশেষ মাওলানা শাহ আহমদ শফি ছিলেন দুই প্রতিষ্ঠানেরই প্রধান।

বেফাকের পাঠ্যপুস্তক ঘেঁটে দেখা যায়, পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত আরবি ওয়ার্ড বুক, উর্দু কী পহেলি কিতাব এবং ফার্সি শিক্ষার বই রয়েছে গুরুত্বসহকারে। এর সংগে ইসলামি তাহযিব, আদর্শ বাংলা পাঠ, প্রাথমিক গণিত, আদর্শ ধারাপাত, আরবি মৌখিক শব্দাবলী, মাই ইংলিশ বুক, ভূগোল ও সমাজ পরিচিতি পড়ানো হয় কয়েক খন্ডে। পঞ্চম শ্রেণিতে (খুসুসি) হয় প্রথম বোর্ড পরীক্ষা। ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে বাংলা কমতে শুরু করে। অষ্টম শ্রেণির (নাহবেমীর) বোর্ড পরীক্ষায় বাংলা রাখা হয় ঐচ্ছিক হিসেবে।

শিক্ষার্থীরা চাইলে এর পরিবর্তে নিতে পারেন অন্য কোনো আরবি বিষয়। এর পরে অনুষ্ঠিত হয় আরও তিনটি বোর্ড পরীক্ষা। এগুলো হলো-শরহে বেকায়া, মেশকাত এবং দাওরা। এগুলোর কোনোটিতেই বাংলা নেই। আরবি, ফার্সি এবং উর্দুতে চলে পড়াশোনা। তবে শিক্ষার্থীদের মধ্যে কেউ কেউ বাংলায় পরীক্ষার উত্তর দেন বলা জানা গেছে।

কোরআনের হেফজ শেষ করে যশোরের দড়াটানা মাদ্রাসায় ষষ্ঠ শ্রেণিতে (মিজান) ভর্তি হন ইখলাস আল ফাহীম। তিনি সম্প্রতি রাজধানীর যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসা থেকে শেষ করেছেন ইফতা। যেটিকে তিনি সম্বোধন করছেন পিএইচডি হিসেবে। ফাহীম জানান, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে মাস্টার্স পর্যন্ত পাঠ্যপুস্তকে তিনি ভাষা আন্দোলনের কোনো ইতিহাস পাননি। এ সম্পর্কিত কোনো আলাপ-আলোচনাও করেন না শিক্ষকরা।

উর্দুর আধিপত্যে বেশ ক্ষোভ এই তরুণ আলেম। এর পরিবর্তে আরবি এবং বাংলায় জোর দেওয়ার দাবি জানান তিনি। ‘বাংলা একেবারেই কম পড়ানো হয় আমাদের। যতোটুকু পড়ানো হয়, তাও গুরুত্বহীনভাবে। আসলে নিরপেক্ষ মতামত দিলে, আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা আরও উন্নত করা দরকার।

এই শিক্ষা গ্রহণ করে আমাদের যতোটা যোগ্য হয়ে ওঠার কথা, তা কিন্তু হচ্ছে না। বাংলাকে মিডিয়াম করলে অনেক শিক্ষার্থী বিষয়ের গভীরে যেতে পারবে। এটা নিয় মুরুব্বিদের বসা উচিত।’

তবে রাজধানীর বেশকিছু প্রতিষ্ঠান উর্দু এবং ফার্সি থেকে বেরিয়ে বাংলায় মনোযোগী হয়েছে। মাওলানা আবু তাহের মেসবাহ মূল বিষয়কে ঠিক রেখে রচনা করেছেন এসো আরবি শিখি, এসো ফিকহ্ শিখিসহ বেশ কিছু বাংলা বই। তবে তাঁর বিরোধীরাও বেশ সরব।

যারা একেবারে উর্দু-আরবিতেই পড়াতে চান। চট্টগ্রামের মেখল মাদ্রাসা থেকে দাওরা শেষ করেছেন আবদুল জব্বার। তিনি বলেন, ‘আমাদের হুজুররাও উর্দুতে কথা বলেন বেশি। সেখানে বাংলায় পড়াশোনার তো প্রশ্নই আসে না। বাংলা নোটও আমরা পড়তে পারতাম না। ব্যাখ্যাগ্রন্থগুলোও আরবি বা উর্দুতে পড়ছি।’

কওমি মাদ্রাসার সাবেক শিক্ষার্থী, বর্তমানে ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মঈনুল ইসলাম তুহিনও চান বাংলার ব্যবহার বাড়ুক কওমি শিক্ষায়। সরকারের সহযোগিতা নিয়ে বাংলায় পাঠ্যপুস্তক রচনার পরামর্শও দেন তিনি।

‘কওমি মাদ্রাসার সিলেবাসে অবশ্যই বাংলা বই বাড়াতে হবে। প্রতিটি জামা’তে (শ্রেণি) অন্তত একটি সহায়ক বাংলা বই থাকুক। ইতিহাসের বইগুলো বাংলায় দিতে পারেন নীতিনির্ধারকরা। ইসলামি ইতিহাসের বইগুলো তো অন্য ভাষায় পড়ার দরকার নেই’- বলেন তুহিন।

তবে কওমি শিক্ষায় বাংলা উপেক্ষিত- এমন অভিযোগে একমত নন রাজধানীর ইসলামবাগ মাদ্রাসার মুহতামিম (অধ্যক্ষ) মাওলানা মঞ্জুরুল ইসলাম আফেন্দী। পাঠ্যসূচিতে বাংলা বই বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তা দেখেন না তিনি। বলেন, ‘কওমি মাদ্রাসায় স্বাভাবিক কারণে ছাত্রদের কোরআন-হাদিসের উপর গুরুত্ব বেশি দিতে হচ্ছে। একইসংগে বাংলা ভাষায় পারদর্শী করার জন্য আমাদের সিলেবাস থেকে শুরু করে নিয়মিত রুটিনে সবসময় চেষ্টা আছে।

ক্লাসে আমরা আরবি এবং উর্দু কথাগুলো বাংলায় বলি। আমাদের পাঠাগারের অধিকাংশ বই বাংলা ভাষায়। আমাদের মাসিক দেয়ালিকা বের হয় বাংলায়, প্রতি সপ্তাহে বক্তৃতা শেখানো হয় বাংলায়। এই প্রোগ্রামগুলো যেহেতু কওমিতে শেখানো হয়, সেহেতু বাংলা উপেক্ষিত- এটি ঠিক নয়।’

অন্যদিকে রাজধানীর জামিয়া কুরআনিয়া লালবাগের সিনিয়র মুহাদ্দিস মুফতি সাখাওয়াত হোসাইন রাজির পাঠদানে বাংলা ভাষার ব্যবহার বাড়ানোতে আপত্তি নেই। তিনি বলেন, ‘যতোটুকু ব্যখ্যাগ্রন্থ আছে, ছাত্ররা বাংলাকে মাধ্যম করলে আলেম হতে পারবে। বাকি পাঠ্যসূচি প্রয়োজনে পরিবর্তন করা যেতে পারে। এগুলো নিয়ে আলোচনা চলবেই। সিলেবাসের পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া।

বর্তমান সিলেবাস ৫০ বছরের নানান পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে এসেছে। আবার এটাই যে শেষ ধাপ, এমনও না। ইতিহাস বা নৈতিকতার কোনো কিছু প্রয়োজন হলে ঢুকানো যেতে পারে।’ উর্দু এবং ফার্সি ভাষা শেখানোর ব্যাপারে তিনি বলেন, ঢাকার বিভিন্ন মাদ্রাসায় আমরা আরবি টু বাংলায় শেখানোতে গুরুত্ব দিচ্ছি। এখনো উর্দু অনেক বইয়ের তরজমা (অনুবাদ) হয়নি।

বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) ২০১৫ সালের তথ্যানুযায়ী, বাংলাদেশে ১৩ হাজার ৯০২টি কওমি মাদ্রাসায় শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৪ লাখের বেশি। তবে বেসরকারি হিসাব মতে, দেশে কওমি মাদ্রাসার সংখ্যা ২০ হাজারেরও বেশি; যার সিংহভাগ শিক্ষার্থীই আবাসিক। এসব প্রতিষ্ঠানে বাংলা ভাষার পাশাপাশি উপেক্ষিত হচ্ছেন বাংলা ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিকরা।

যাদের রক্তে বাংলা আজ দেশের গণ্ডি ছাপিয়ে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের গৌরব ছিনিয়ে এনেছে- সেই ভাষা সৈনিকরা অপরিচিত কওমি শিক্ষার্থীদের কাছে। এমনকি দিবসভিত্তিক কোনো আলোচনাও হয় না বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস অন্য দিনের মতোই একটি সাধারণ দিন, কওমি শিক্ষার্থীদের কাছে।

‘দিবস পালনের বিষয়ে শরীয়তের একটি দৃষ্টিভঙ্গি আছে; বিধি-নিষেধ আছে। এর বাইরে দিবসের চেয়ে এর আসল যে কাজ, সেগুলোই আমরা করছি। ভাষা এবং বাংলা সাহিত্য চর্চা করে আমাদের ছাত্ররা। আমার মাদ্রাসার শিক্ষার্থীরা বাংলা ম্যাগাজিন ‘‘আন্ নূর’’ প্রকাশ করছে ১৫ বছর ধরে।’ বললেন সিলেটের গওহরপুর মাদ্রাসার মুহতামিম মাওলানা মুসলেহ উদ্দিন।

কওমি ধারার প্রভাবশালী আলেম মুফতি সাখাওয়াত হোসাইনও কথা বললেন একই সুরে। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে শিক্ষার্থীদের ইতিহাস এবং গৌরব জানাতে কোনো আয়োজন আছে কিনা, এমন প্রশ্নের জবাবে জানান, ‘সুনির্দিষ্ট দিনে নেই। প্রতি সপ্তাহের বৃহস্পতিবার আমাদের ছেলেরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নিজেরা আলোচনা করে। মাতৃভাষা আল্লাহ পাকের নেয়ামত। আমরা এর পরিচর্যা করি। একদিনে প্রেম-ভালোবাসা উথলে পড়লো, বছরের বাকি সময় ভুলে থাকলাম- এটি তো ঠিক নয়।’

এ প্রসংগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক, অধ্যাপক রোবায়েত ফেরদৌস বলেন, ‘ভাষা আন্দোলনসহ আমাদের জাতীয় অর্জন অবশ্যই কওমি শিক্ষার পাঠ্যসূচির মধ্যে থাকতে হবে। এবং জাতীয় উৎসবগুলো অবশ্যই মাদ্রাসাগুলোতে পালন করতে হবে; উদযাপন করতে হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। ধর্মের সংগে এর কোনো বিরোধ নেই। আমাদের এখানে কেউ কেউ এক ধরনের কূপমন্ডূক ব্যাখ্যা দেন। এর উদার ব্যাখ্যা দিতে হবে।’

প্রিয় পাঠক, আপনিও লিখতে পারেন আমাদের পোর্টালে। কোন ঘটনা, পারিপাশ্বিক অবস্থা, জনস্বার্থ, সমস্যা ও সম্ভাবনা, বিষয়-বৈচিত্র বা কারো সাফল্যের গল্প, কবিতা,উপন্যাস, ছবি, আঁকাআঁকি, মতামত, উপ-সম্পাদকীয়, দর্শনীয় স্থান, প্রিয় ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ফিচার, হাসির, মজার কিংবা মন খারাপ করা যেকোনো অভিজ্ঞতা লিখে পাঠান সর্বোচ্চ ৩০০ শব্দের মধ্যে। পাঠাতে পারেন ছবিও। মনে রাখবেন দৈনিক আলোকিত ভোর.কম পোর্টালটি সকল শ্রেণী পেশার মানুষের জন‌্য উন্মুক্ত। তাছাড়া, স্বভাবতই আপনি নানান ঘটনার স্বাক্ষী। শেয়ার করুন আমাদের। ঘটনার বিবরণ, ছবি, ভিডিও আমাদের ইমেলে পাঠিয়ে দিন। কোন এলাকা, কোন দিন, কোন সময়ের ঘটনা তা জানাতে ভুলবেন না। আপনার নাম এবং ফোন নম্বর অবশ্যই দেবেন। আপনার পাঠানো খবর অথবা লেখা মান সম্পন্ন এবং বস্তুনিষ্ঠ হলে তা প্রকাশ করা হবে আমাদের ওয়েবসাইটে। লেখা পাঠানোর ইমেইল- dailyalokitovor@gmail.com