আন্তর্জাতিক

ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের চেয়ে শক্তিশালী ইরান!

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ইরাকের রাজধানী বাগদাদে মার্কিন দূতাবাস ঘিরে উত্তেজনাকর বিক্ষোভের দ্বিতীয় দিনে বুধবার কয়েক হাজার ইরানপন্থী প্রতিবাদকারী অবরোধ তুলে ফিরে গেছেন। এতে দূতাবাস ভবনে আটকে পড়া মার্কিন কূটনীতিকরা অবরুদ্ধ পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পেয়েছেন। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য একটি সংকট অতিক্রান্ত হলো। কিন্তু ইরাকের মাটিতে মার্কিন দূতাবাস টানা দুইদিন ঘিরে রাখতে মিলিশিয়াদের মোতায়েন করে ইরান দেখিয়ে দিয়েছে দেশটির সরকারের ভেতরে তারা কতটা প্রভাবশালী। মার্কিন সংবাদমাধ্যম নিউ ইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে এমন আভাস দেওয়া হয়েছে।

ইরানপন্থী বিক্ষোভকারীরা দূতাবাস ভবন ঘিরে ‘আমেরিকা নিপাত যাক’ স্লোগান দেয়। কয়েকজন ভবনের দেয়াল টপকে ভেতরে প্রবেশের চেষ্টা করে। আর কয়েকজন একদিন আগে পুড়িয়ে দেওয়া অভ্যর্থনা কক্ষের ছাদে উঠে পড়ে।

আগের দিন মঙ্গলবার পরিস্থিতি ছিল আরও ভয়াবহ। ওই দিন বেশ কিছু বিক্ষোভকারী জোর করে ঢুকে পড়ে ভবনে এবং মূল ভবনের বাইরে থাকা কয়েকটি ভবনে অগ্নিসংযোগ করে। বুধবার বিক্ষোভকারীদের সংখ্যা কম ছিল এবং কেউই ভবনের গেট দিয়ে প্রবেশের চেষ্টা করেনি।

এই বিক্ষোভকারীদের বেশিরভাগই ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া গোষ্ঠীর। গত সপ্তাহে সিরিয়া ও ইরাকে মার্কিন বিমান হামলায় ক্ষুব্ধ ছিল তারা। মার্কিন প্রতিরক্ষা দফতর পেন্টাগনের মোতায়েনকৃত অতিরিক্ত সেনারা বিক্ষোভকারীদের পিছু হটিয়ে দিতে টিয়ার গ্যাস ছোড়ে।

তবে সব বিক্ষোভকারী দূতাবাস ছেড়ে যায় ইরান সমর্থিত মিলিশিয়া নেতার নির্দেশ পাওয়ার পর। নির্দেশে পেয়ে তারা হেঁটে বা ট্রাকে করে চলে যায়।

বিক্ষোভের মূল শক্তি পিএমএফ জোট ইরাকের ইরান সমর্থিত শিয়াপন্থী আধাসামরিক বাহিনীগুলোকে নিয়ে গঠিত। দ্বিতীয় দিনের বিক্ষোভের একপর্যায়ে ইরাক সরকারের আহ্বানে সাড়া দিয়ে সমর্থকদের দূতাবাস কম্পাউন্ড ত্যাগের আহ্বান জানায় পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্স। এতে বলা হয়, আপনাদের বার্তা পৌঁছে গেছে।

মিলিশিয়া নেতা ঘোষণা দিয়েছেন, ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আদেল আব্দুল মাহদির সঙ্গে সমঝোতার পর বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। তিনি দাবি করেছেন, ইরাক থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারে আইন প্রণয়নে সম্মত হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।

এটি ছিল প্রথম দফা, আরও কয়েক দফা শিগগিরই আসবে।
নিউ ইয়র্ক টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এমন আইন পাস হোক বা না হোক, ঘটনাটি ইরাকের নতুন বাস্তবতা তুলে ধরেছে। বাগদাদের দূতাবাসে মার্কিন কূটনীতিকদের অবরুদ্ধ করে রাখতে মিলিশিয়া মোতায়েন করার ইরানি সামর্থ্য দেখিয়ে দিয়েছে ইরাকি সরকারের মধ্যে তারা কতটা প্রভাবশালী হয়ে উঠেছে।

পশ্চিমা স্বার্থের পক্ষে বন্ধুত্বপূর্ণ ইরাকি সরকার গড়তে ১৬ বছরের মার্কিন প্রচেষ্টার পরও ইরাকের নেতারা যুক্তরাষ্ট্রের বিমান হামলার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন। এমনকি বিক্ষোভকারীদের দূতাবাস প্রাঙ্গণে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে। বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারীকে ইরাকের নিরাপত্তাবাহিনীর উর্দি পরে থাকতেও দেখা গেছে। অথচ যুক্তরাষ্ট্রের এই ১৬ বছরের চেষ্টায় ব্যয় হয়েছে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের বেশি ও প্রাণ গেছে ৫ হাজার মার্কিন সেনার।

প্রতিবেদনে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, সরকারের এমন অবস্থানের কারণে ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান প্রশ্নের মুখে পড়েছে।

দূতাবাস ঘিরে দুই দিনের অচলাবস্থা অতীতে তেহরান ও লিবিয়ার বেনগাজিতে মার্কিন কূটনৈতিক স্থাপনায় হামলার কথা মনে করিয়ে দিয়েছে। যদিও এবারের হামলা শেষ হয়েছে শান্তিপূর্ণভাবে কোনও হতাহত ছাড়াই। তবে এটিই হয়ত শেষ কথা নয়।

ওয়াশিংটনের মিডল ইস্ট ইন্সটিটিউটের জ্যেষ্ঠ গবেষক রান্ডা স্লিম বলেন, এটি ছিল প্রথম দফা, আরও কয়েক দফা শিগগিরই আসবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের পরিস্থিতি বিবেচনায় ভুলের কারণেই এই অচলাবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। শুক্রবার ইরাকের সামরিক ঘাঁটিতে হামলায় মার্কিন ঠিকাদার নিহত এবং বেশ কয়েকজন ইরাকি ও মার্কিন সামরিক কর্মী হতাহতের ঘটনায় এই সংকটজনক পরিস্থিতির সূত্রপাত। যুক্তরাষ্ট্র এই হামলার জন্য ইরান সমর্থিত কাতাইব হিজবুল্লাহকে দায়ী করে। তবে ওই রকেট হামলার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে মিলিশিয়া গোষ্ঠীটি।

সিরিয়া ও ইরাকে মিলিশিয়া গোষ্ঠী নিয়ন্ত্রিত ও পরিচালিত পাঁচটি ঘাটিতে বিমান হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নেয় যুক্তরাষ্ট্র। এতে প্রায় দুই ডজন নিহত ও দ্বিগুন সংখ্যক হতাহত হন। ইরান দাবি করেছে, নিহতের সংখ্যা ৩১।

ইরানের মিত্ররা ভেবেছিল তারা হিট অ্যান্ড রান স্টাইলে হামলা চালাতে পারবে পাল্টা হামলার আশঙ্কা থাকবে না। আর যুক্তরাষ্ট্র ভেবেছিল কোনও পরিণতি ছাড়াই মিলিশিয়াদের তারা শায়েস্তা করতে পারবে।

উভয়ের এই মূল্যায়ন ভুল ছিল বলে প্রমাণিত হয়েছে।

মার্কিন বিমান হামলা ইরাকে বড় ধরনের সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র এটি হয়ত আশা করেনি। এখন ইরাক থেকে সব সেনা প্রত্যাহারের আওয়াজ উঠছে।

এর আগে ইরাকি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভকারীদের গ্রিন জোনেই প্রবেশ করতে দেয়নি। কিন্তু এবার বিক্ষোভকারীরা দূতাবাস প্রাঙ্গণ পর্যন্ত পৌঁছে যায়। গত কয়েক মাসে সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের ইরাকি সেনারা গুলি ও টিয়ার গ্যাস ছুড়লেও এবার তা করেনি। মঙ্গলবার তারা নিজেদের লোকদের মুখোমুখি না হয়ে এই দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের হাতে ছেড়ে দিয়েছে।

বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মিলিশিয়াদের ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকলেও তারা মূলত ইরাকি নাগরিক এবং ইরাকের নিরাপত্তাবাহিনীর ছায়াতলে রয়েছে। যদিও তারা অনেক বেশি স্বাধীনতা পায়।

কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন মার্কিন ঠিকাদারকে হত্যা ও দূতাবাসে হামলাকে ইরানের সরাসরি কর্মকাণ্ড হিসেবে দেখছে।

গত দুই মাসে মার্কিন সামরিক কর্মীরা আছেন এমন স্থাপনায় মিলিশিয়ারা ১১টি হামলা চালিয়েছে
প্রশাসনের ইরান বিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি ব্রায়ান হুক বুধবার সিএনএনকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এমন কৌশল ইরান ব্যবহার করে। চল্লিশ বছর পূর্বে তারা আমাদের দূতাবাসে হামলে পড়েছিল। আবার চল্লিশ বছর পর আমাদের দূতাবাসে হামলা চালাতে জঙ্গিদের নির্দেশ দিয়েছে তারা।

মঙ্গলবার ট্রাম্প টুইটে বলেছেন, ইরানকে যুক্তরাষ্ট্রের স্থাপনায় হামলায় প্রাণহানি ও ক্ষতির জন্য পুরোপুরি দায় নিতে হবে। তাদেরকে চড়া মূল্য দিতে হবে।

ট্রাম্পের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি বুধবার বলেছেন, আপনি কিছুই করতে পারবেন না।

ইসলামিক স্টেট বা আইএস বিরোধী লড়াইয়ে ইরাকের মিলিশিয়া গোষ্ঠীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এসব সশস্ত্র গোষ্ঠীর বেশিরভাগই শিয়া মুসলিমদের নিয়ে গঠিত ও ইরান সমর্থিত। আইএস পুরোপুরি পরাজিত হওয়ার পর ইরান সমর্থিত মিলিশিয়ারা ইরাকে যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকাণ্ডের বিরোধিতা শুরু করে। বিশেষ করে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা পুনরায় জারি করার পর।

ট্রাম্প প্রশাসনের কর্মকর্তাদের মতে, গত দুই মাসে মার্কিন সামরিক কর্মীরা আছেন এমন স্থাপনায় মিলিশিয়ারা ১১টি হামলা চালিয়েছে। ভবিষ্যতের হামলা ঠেকাতে বিমান হামলা প্রয়োজনীয় ছিল।

ইরাকের পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের অধীনে ৩০টি মিলিশিয়া গোষ্ঠী রয়েছে। এসব গোষ্ঠীর প্রত্যেকের নিজেদের নেতা রয়েছে। বেশিরভাগ সময় তারা একে অন্যের সঙ্গে একমত হয়। সরকার বা কোনও একটি গোষ্ঠী তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে সমর্থ নয়, এতে করে বিপজ্জনক জটিলতা তৈরি হয়েছে।

রবিবার বিমান হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্র যদি প্রতিরোধের কোনও বার্তা দিতে চেয়ে থাকে তাহলে ইরাকি মিলিশিয়ারাও আমেরিকানদের প্রতি তাদের বার্তা জানিয়ে দিয়েছে।

দূতাবাসের দেয়ালে একটি গ্রাফিতিতে কাসিম সোলেমানির ছবি আঁকা রয়েছে। তিনি ইরানের বিপ্লবী বাহিনীর অভিজাত শাখা কুদস ফোর্সের নেতা। তাকে নিয়ে লেখা হয়েছে, ‘এখান দিয়ে তিনি ভেতরে গেছেন’।

কয়েকজন মিলিশিয়া সদস্য দূতাবাসের অভ্যর্থনা এলাকায় সবুজ ব্যানার টানিয়ে দিয়েছেন। তাতে হলুদ রঙে লেখা রয়েছে, ‘পপুলার মোবিলাইজেশন কমিশন’।

এই সংগঠনের ছায়াতলে রয়েছে মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলো। এর মধ্য দিয়ে তারা বার্তা দিতে চেয়েছে, কারা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে তা সম্পর্কে যদি কোনও সংশয় থাকে তাহলে তা সরিয়ে ফেলুন।

বুধবার পড়ন্ত বিকেলে কমিশন মিলিশিয়া সদস্যদের বিক্ষোভের ইতি টানতে নির্দেশ দেয় ‘সরকারের সার্বভৌমত্বের’ প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছে। বিক্ষোভকারীদের কাছে এর মানে হলো, বার্তা পৌঁছে গেছে।

Tags

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
You cannot copy content of this page
Close
Close