ফিচারসাক্ষাৎকার

সাইকেল চালিয়ে হিমালয়ে জাবি শিক্ষার্থী তোজাম্মেল

জাবি প্রতিনিধি: ছোটবেলায় বাবা-কাকা কিংবা দাদা নানাদের মুখে শুনতাম সাইকেল চালানো উচ্চ রক্তচাপ কমায়, এটি হার্ট অ্যাটাক ও স্ট্রোকের ঝুঁকি থেকে শরীরকে মুক্ত রাখে।কিন্তু এগুলো শুধু জনশ্রুতি নয়, গবেষণায়ও প্রমাণিত। এ ছাড়া প্রতিদিন সাইকেল চালানোর রয়েছে আরো অনেক উপকারিতা। তাই তো অনেকেই সাইকেল চালানোকে প্রাত্যহিক ব্যায়ামের একটি অংশ হিসেবে নির্বাচন করেন। আবার অনেকের কাছেই সাইকেল চালানো হয়ে যায় নেশা। নেশার টানে সাইকেল নিয়ে ছুটে চলে দূর-দূরান্তে।

এমনি মানুষের তালিকায় অন্যতম নাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের গণিত বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ তোজাম্মেল হোসেন। নতুন কিছু জানা ও দেখার নেশায় নিয়মিত সাইকেল নিয়ে হাজার হাজার কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে ছুটে চলেন দেশের একপ্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে। তার সাইকেল চালানোর শুরু, আগ্রহ ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আলোকিত ভোরের বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিবেদক শিহাব উদ্দিন।

আলোকিত ভোর প্রতিবেদক: আপনার পুরো নাম?

মোঃ তোজাম্মেল হোসেন মিলন।

আলোকিত ভোর প্রতিবেদক: আপনার বাড়ি কোথায়? শিক্ষাগত যোগ্যতা কি?

উঃ আমার গ্রামের বাড়ি পাবনা কিন্তু বাবার চাকরিসূত্রে ছোটবেলা থেকেই গাজীপুরে থাকা হয়। আমি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে স্নাতক শেষ করেছি। বর্তমানে সেখানেই গণিতে মাস্টার্স করছি।

আলোকিত ভোর প্রতিবেদক: সাইকেলে করে দেশ ও দেশের বাইরে ঘোরার চিন্তা মাথায় কিভাবে এলো?

উঃ আসলে নতুনকিছু জানার ও শেখার নেশাটা আমার ছোটবেলা থেকেই। আর যেটা কিনা ভ্রমণের মাধ্যমেই সম্ভব, সাথে প্রকৃতির অপরূপ সৌন্দর্য দুচোখ ভরে উপভোগ করার সুযোটা তো রয়েছেই। কিন্তু আমাদের দেশের প্রেক্ষিতে ছাত্র অবস্থায় ভ্রমণ করা আসলে অতটা সহজ নয়। যেহেতু খরচের একটা বিষয় থাকে আবার আমাকে নিজের খরচটা নিজেই চালাতে হতো তখন হঠাৎ করেই মাথায় এল আমিতো চাইলে সাইকেলে করে দেশভ্রমণ করতে পারি। সেই চিন্তা থেকেই আসলে শুরু করা এভাবে আস্তে আস্তে বাংলাদেশের ৬৩ টি জেলা এবং দেশের বাইরে ঘুরতে সক্ষম হয়েছি।

আলোকিত ভোর প্রতিবেদক: প্রথম কোথায় বের হয়েছিলেন?হিমালয় অঞ্চল হয়ে এর আগে কি কোন বাংলাদেশি খারদুংলা গিয়েছেন?

সাইকেল চালিয়ে আমার প্রথম লং রাইড ছিল পঞ্চগড়ে। গাজীপুর, ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, গাইবান্ধা, রংপুর, নীলফামারী জেলা হয়ে পঞ্চগড় গিয়েছিলাম। এই ট্যুরে প্রায় এক হাজার কিলো দূরত্ব অতিক্রম করেছিলাম।

আমাদের আগে আরও তিনজন বাংলাদেশি খারদুংলায় গিয়েছিলেন। তারা হলেন নিয়াজ মোরশেদ ভাই, সাকিব মাহমুদ ভাই এবং সাজনান মোহাম্মদ নিবিড় ভাই। কিন্তু আমার জানামতে আমরাই প্রথম হিমালয় অঞ্চল হয়ে খারদুংলা গিয়েছিলাম।

আলোকিত ভোর প্রতিবেদক: সাইকেল দিয়ে ভ্রমণ এ একটা আনন্দ ও দুঃখের ঘটনা বলুন।

সাইকেল ভ্রমণে বেরিয়ে অনেক আনন্দের ঘটনা ঘটেছে তার মধ্যে অন্যতম বলা যেতে পারে যে দিন খারদুংলা অনুমতি পেলাম সেই মুহূর্তটা ছিল সব চাইতে বেশি আনন্দের যেটা আসলে ভাষায় প্রকাশ করা যাবে না আনন্দে চোখে পানি চলে এসেছিল সেদিন।

• দুঃখের বা কষ্টের ঘটনা খুব একটা বেশি না ঘটলেও দুইটা ঘটনার কথা আমি বলবো প্রথমটি হলো যেদিন জম্মু-কাশ্মীরের চন্দরকোট এলাকায় ছিলাম সেদিন রাতে পুলিশ আমাদেরকে গ্রেপ্তার করেছিল এবং সারারাত আমাদেরকে থানায় কাটাতে হয়েছিলো। সেটা আসলে ছিল পুরো বিভীষিকাময় একটা রাত।

• আর দ্বিতীয়টি হলো ধর্মশালার পর একটা জায়গায় পাহাড়ি অঞ্চলে আমাদেরকে থাকতে হয়েছিল সেখানে আসলে কোন খাবার ছিল না তাই বাধ্য হয়ে আমাদেরকে নেপালি চাওমিন খেতে হয়েছিল সেখানে কাঁচা বাঁধাকপি ও অন্যান্য সব্জি ছিল যেটা খেয়ে এমন অবস্থা হয়েছিল যে প্রায় তিন রাত পেটের যন্ত্রনায় ঘুমাতে পারিনি। দিনের বেলায় পেট কামড়ানোর কারণে পেটে গামছা বেঁধে সাইকেল চালাতে হতো সে সময় চোখ দিয়ে টপটপ করে পানি পড়তো কিন্তু কিছু করার ছিল না। বাধ্য হয়ে সহ্য করতে হয়েছে। আশেপাশে কোন ডাক্তার বা অন্য কিছু ছিল না যে চিকিৎসা নিবো।

আলোকিত ভোর প্রতিবেদক: শুধু কি ভ্রমণ করেছেন নাকি জনসচেতনামূলক কাজও করেছেন?

সাইকেল নিয়ে ভ্রমন এর পাশাপাশি জনসচেতনামূলক কিছু কাজ করার সুযোগ রয়েছে। যেমন ক্যান্সারের বিরুদ্ধে সচেতনতা, পরিবেশ দূষণ রোধে সাইকেল এর ব্যবহার হিসেবে আমরা কলকাতায় র‌্যালী করেছি। এছাড়া দুর্নীতি এবং মাদকের বিরুদ্ধেও সাইকেল র‌্যালী করার সুযোগ হয়েছে।

আলোকিত ভোর প্রতিবেদক: ব্যক্তিগতভাবে কোন জনকল্যাণমূলক কাজ করেছেন কি?

হ্যাঁ। চাঁপাইনবাবগঞ্জের রহনপুরে নিজ উদ্যোগে প্রায় আড়াই হাজার মানুষকে শীতবস্ত্র প্রদান করেছিলাম। এছাড়া ২০১৭ সালে সিরাজগঞ্জে বন্যার্ত প্রায় ২০০ পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছি। এছাড়া আমি নিয়মিত ব্লাড ডোনেট করি।

আলোকিত ভোর প্রতিবেদক: সাধারণত বেশিরভাগ মানুষ সমতলে সাইকেল চালাতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে আপনি কেন পাহাড় উঁচু নিচু বন্ধুর পথ বেছে নিলেন?

ব্যক্তিগতভাবে আমি আসলে একটু অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মানুষ। পাহাড়ি ও দুর্গম রাস্তায় সাইকেল চালানো একটা চ্যালেঞ্জ। সেখানে সব সময় প্রতিকূল অবস্থার সাথে মানিয়ে নিতে হয়। আর চ্যালেঞ্জ নিতে সবসময় বেশি পছন্দ করি এই কারণে আমার এই পথটা বেছে নেয়া।

আলোকিত ভোর প্রতিবেদক: এই ভ্রমণে আপনি কতো কিলোমিটার সাইক্লিং করেছেন এবং এর মধ্য দিয়ে আপনি কি কি শিখলেন বা জানলেন অল্প কথায় বলুন?

খারদুংলায় যাবার পথে আমাকে প্রায় ৪ হাজার ৭০০কি কিলোমিটার সাইকেল চালাতে হয়েছে। এই ভ্রমণের মাধ্যমে আসলে আমি বিভিন্ন কালচারের মানুষের সাথে মিশতে পেরেছি তাদের সংস্কৃতির সাথে পরিচিত হয়েছি। বিভিন্ন এলাকার খাদ্যভ্যাস পরিবেশ আবহাওয়া সবকিছুর সাথে একটা অভিজ্ঞতা হয়েছে। সবচেয়ে বড় কথা হল যে নিজেকে কিভাবে সব ধরনের পরিবেশে মানিয়ে নিতে হয় কিভাবে মানুষের সাথে মিশে যেতে হয় সেটা শিখেছি। তার চাইতে বড় কথা কিভাবে নিজের সামর্থের বাইরে গিয়েও অনেক বড় কিছু করা যায় সেটা শিখেছি। সবাই দেখবেন বলবে যে শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও চেষ্টা করে যাবো। কিন্তু না আমি এখান থেকে শিখেছি যে আগে আমার কাজটা শেষ করবো তারপরে না হয় মরবো।

আলোকিত ভোর প্রতিবেদক: আপনার গল্পটি আলোকিত ভোরকে শেয়ার করার জন্য ধন্যবাদ।

আপনাকেও ধন্যবাদ।

Tags

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close