টপ নিউজ

জোহা রাবিতে সীমাবদ্ধ নয়, জাতীয় দিবস চাই

কাজী আশফিক রাসেল: ‘কোন ছাত্রের গায়ে গুলি লাগার আগে যেনো সে গুলি আমার গাঁয়ে লাগে’ – বর্তমান ঘুণে ধরা সমাজ ব্যবস্থায় শিক্ষা যখন নিছকই ব্যবসায়িক পণ্য, একজন শিক্ষক যখন নীতি বিবর্জিত হয়ে বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়াচ্ছে, স্বার্থবাদী রাজনীতির নির্লজ্জ তোষামোদিতে মহান পেশাটাকে কলুষিত করে চলেছে তখন ইতিহাসখ্যাত এই অমর বাক্যটি শিক্ষক নামধারীদের জন্য যথেষ্ট শিক্ষণীয়। হ্যাঁ, আমি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক প্রক্টর অধ্যাপক শহীদ শামসুজ্জোহার কথা বলছি, যিনি কেবল বক্তব্যেই সীমাবদ্ধ নন বাস্তবিকার্থেই শিক্ষার্থীদের জীবনের নিরাপত্তা দিয়েছিলেন নিজের জীবনের বিনিময়ে।

১৮ ফেব্রুয়ারি ১৯৬৯ সাল। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা প্রত্যাহারের দাবি এবং সার্জেন্ট জহুরুল হক হত্যার পর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান তখন প্রতিবাদমুখর, সেই প্রতিবাদের অংশ হিসেবে ১৪৪ ধারা ভেঙে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রাজপথে বিক্ষোভ মিছিল বের করে। অন্যদিকে, আন্দোলনকারীদের দমন করতে সেদিন পুলিশ, ইপিআরের সাথে ছিলো রাইফেল সজ্জিত সেনাসদস্যরা; বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক তালাবদ্ধ করে রাখা হয়- যেন আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বের হতে না পারেন। নিপীড়ক বাহিনীর রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে আন্দোলনরত বিক্ষুব্ধ ছাত্র-জনতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের সীমানাপ্রাচীর টপকে বের হতে শুরু করলে শিক্ষকরা প্রধান ফটকের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রহরীকে ফটক খুলে দেয়ার নির্দেশ দেন।

কিছুক্ষণের মধ্যেই বিশ্ববিদ্যালয় প্রধান ফটক সংলগ্ন ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়কে নামে বিক্ষোব্ধ ছাত্র-জনতার ঢল। সেনাবাহিনীর সাথে বাকবিতণ্ডায় বিক্ষোব্ধ ছাত্ররা পাকবাহিনীর একটি গাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে দিলে পরিস্থিতি আরো উত্তপ্ত হয়। মুক্তিকামী ছাত্র-জনতার বিরুদ্ধে সামরিকজান্তার দোসররা রাইফেল উঁচিয়ে প্রস্তুতি নিতে থাকলে, এমন সংকটময় মুহূর্তে ড. জোহা সেনা কর্মকর্তা ক্যাপ্টেন হাদির সঙ্গে কথা বলার জন্য এগিয়ে যান এবং তাকে অনুরোধ করেন যেন সেনাবাহিনীর তরফ থেকে কোনো ধরনের উসকানিমূলক পদক্ষেপ না নেয়া হয়। ড. জোহা সামরিক কর্মকর্তা ও ম্যাজিস্ট্রেটদের উদ্দেশ্যে হাত উঁচু করে অনুরোধের ভঙ্গিতে জোরে জোরে বলতে থাকেন ‘ডোন্ট ফায়ার! আই সেইড ডোন্ট ফায়ার! আমার ছাত্ররা এখান থেকে এখনই চলে যাবে।’ কিন্তু পাক হায়েনারা সেদিন ড. জোহার সে অনুরোধে কর্ণপাত করে নি বরং বেলা ১১টার দিকে ক্যাপ্টেন হাদী পিস্তল বের করে ড. জোহাকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়েন। গুলিবিদ্ধ ড. জোহাকে পরে রাজশাহী মিউনিসিপল অফিসে নিয়ে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়। ড. জোহার মৃত্যুর খবর প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের বিক্ষুব্ধ জনতা ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করে পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিরোধ গড়ে তোলে; ক্রমেই গণআন্দোলন গণঅভ্যুত্থানে পরিণত হয়। উনসত্তরের এই গণঅভ্যুত্থানেই রচিত হয়েছিলো বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ভিত।

ড. জোহার কাছে তাঁর নিজের জীবনের চেয়ে বড় ছিল তাঁর ছাত্রদের জীবন। তাই তিনি নিজ জীবন বিসর্জন দিয়ে বাঁচিয়েছিলেন তাঁর প্রিয় ছাত্রদের জীবন। এই মহান শিক্ষক পুরো শিক্ষক সমাজের জন্যই অঢেল গৌরব ও অনুপ্রেরণার আধার; তাঁর শিক্ষকতা সমগ্র বিশ্বের শিক্ষকদের জন্য শিক্ষণীয়। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনার দ্বিতীয় নজির নেই।
ড. জোহার স্মৃতিকে চিরস্মরণীয় রাখতে তাঁর নামে একটি ছাত্র হলের নামকরণ করেছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। একই বিশ্ববিদ্যালয়ে রয়েছে ‘স্ফুলিঙ্গ’ নামে জোহার স্মৃতি ভাস্কর্য , প্রধান ফটকে গুলিবিদ্ধ হওয়ার স্থানটিতে নির্মাণ করা হয়েছে জোহা স্মৃতি ফলক এবং প্রশাসনিক ভবনের সামনে রয়েছে শহীদ ড. জোহার মাজার।

ড. জোহার অবদানকে স্মরণে রাখতে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন প্রতি বছর ১৮ ফেব্রুয়ারিকে ‘শিক্ষক দিবস’ হিসেবে পালন করে আসছে। ড. জোহা ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে প্রথম শহীদ বুদ্ধিজীবী। বায়ান্নের ভাষা আন্দোলনেও তিনি প্রত্যক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। জাতীয় আন্দোলনে দেশের জন্য জীবন উৎসর্গ করলেও এখনো তাঁর বীরত্বগাথার সেই ইতিহাস একটি গণ্ডির ভেতর অর্থাৎ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। ড. শামসুজ্জোহার শাহাদত বরণের দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও জাতীয়ভাবে আজও তিনি অবহেলিত। এখন পর্যন্ত এ দিবসটিকে সরকারিভাবে পালন করার কোনো কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।

একজন শামসুজ্জোহার আত্মদান বা ১৮ ফেব্রুয়ারির সেই ইতিহাস শুধু বাংলাদেশ নয়; সারাবিশ্বের ইতিহাসে বিরল। ইতিহাসের এই মহান শিক্ষকের স্মৃতিকে ধরে রাখতে পাঠ্যপুস্তকে তার আত্মদানের কাহিনী অন্তর্ভূক্ত করাও এখন সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। ড. জোহা একটি চেতনা ও আদর্শের নাম; জোহা দিবসের জাতীয় স্বীকৃতিতে কিছুটা হলেও এই মহান শিক্ষকের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হবে এবং জোহার স্মৃতি ও আদর্শকে জাতির সামনে চির অম্লান করে রাখবে।

কাজী আশফিক রাসেল

লেখকঃ শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Tags

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close