টপ নিউজমতামত

ইসলাম ও ষড়যন্ত্র, একটি বাস্তব চিত্র!

২০০১ সালের ১১ সেপ্টেম্বর, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে (ওয়ান ইলেভেন নামে খ্যাত) হামলার পর তালিবানের উপর দোষ চাপিয়ে তাদের সন্ত্রাসী আখ্যা দিয়ে ইঙ্গ-মার্কিনিরা ন্যাটোর মাধ্যমে প্রথম আফগানিস্তান আক্রমণ করে। উদ্দেশ্য ভিন্ন হলেও তাৎক্ষণিক বহির্বিশ্বকে বুঝিয়েছিলো আক্রমণের মাধ্যমে আল কায়েদাকে পরাজিত করে দেশটি থেকে কট্টরপন্থী তালিবানকে ক্ষমতাচ্যুত করবে। এবং সেই সাথে আফগানিস্তানে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সৃষ্টি করবে। যদিও এসব উদ্দেশ্যের কিছুটা পূরণ হলেও আজ পর্যন্ত আফগানিস্তানে মার্কিন-নেতৃত্বাধীন হস্তক্ষেপ একটি প্রলম্বিত যুদ্ধরূপে এখন পর্যন্ত চলমান।

মাঝের এই কুঁড়ি বছরের যুদ্ধে নিরপরাধে মৃত্যু বরণ করেছে আফগানিস্তানের প্রায় ৫-৭ লক্ষ সাধারণ মানুষ, ধ্বংস হয়েছে আফগান সংস্কৃতি ও ইতিহাসের নানান ঐতিহ্যের চিহ্ন। দারিদ্র‍্যে জর্জরিত হয়ে দেশ ছেড়ে উদবাস্তু হয়েছে কয়েক লক্ষ জনসাধারণ।
এতোকিছুর পরও দীর্ঘ ২০ বছরের মাথায় আজ সেই তালিবানের সাথে চুক্তিপত্র সই করে বলা হলো তালিবানরা সন্ত্রাসী নয়।

এরপর ধরা হলো ইরাকটাকে। ২০০৩ সালে মরনাস্ত্র থাকার অপবাদ দিয়ে বোমা-হামলার মাধ্যমে প্রাচীন সভ্যতার অন্যতম লীলাভূমি সাজানো গোছানো এই ইরাকটকে ছিন্নবিচ্ছিন্ন করে শাসক সাদ্দাম হোসেনকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা হলো, তারপর বহু বছর পর বলা হলো ইরাকের কাছে কোন মরনাস্ত্র ছিলোনা। ২০০৩ সালের সেই ইরাক হামলার সিদ্ধান্ত ছিলো নিছক একটি ভুল। এবারও গল্পের প্রধান চরিত্রে সেই ইঙ্গ-মার্কিন আঁতাতেরা।

এই যে দুটি দেশে কুড়ি বছর ধরে চলমান রাখা দুটি ভিন্ন যুদ্ধে লাখো লাখো মুসলিমদের বিনা বিচারে হত্যা করা হলো, লাখো মানুষকে বাস্তুচ্যুত করা হলো, এর দায় কে নেবে? কিংবা এর জবাব কার কাছ থেকে আদায় করা হবে? অথবা কে আদায় করবে?
আমরা ভেবে দেখেছি কখনো ইরাক-আফগান ছাড়া অন্যান্য কান্ট্রির মুসলিম কমিউনিটির লোকেরা! না ভাবিনি, কারন এটা আমাদের ভাবার তেমন কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ই নয়। হয়তো

একই কমিউনিটির হওয়ায় সাময়িক খারাপ লেগেছে কিন্ত মার্কিনীদের সাথে এই নিয়ে তর্ক জুড়ে আমরা নিজেদের আখের গোছানোতে বাধা-বিগ্নতা তৈরি করতে চাইনি কিংবা এখনো চাচ্ছিনা।

আমরা নাকে তেল পলিশ করে দেখেও না দেখার ভান করে দিব্বি ঘুমাচ্ছি। কারন, মার্কিনীদের ওই “অভ্যন্তরীণ বিষয়” নামের ঝুলানো মুলা আমাদের সমনে আছে তো!
তাই আমরা এখনো ঘুমিয়েই আছি, আশাকরি আরো কয়েকদশক এই নিদ্রার অবসান আমরা ঘটাবোনা।

অথচ এই ইঙ্গ-মার্কিন একদিন আমাদেরও ছাড়বেনা, এই ভারত-ইসরায়েল-যুক্তরাষ্ট্র লবি সন্ত্রাস নাম দিয়ে একে একে সারা বিশ্বের সকল মুসলিমদেরই একদিন ধ্বংস করবে। একটু খেয়াল করলেই আমরা তার স্পষ্ট রূপরেখা দেখতে পাবো, আমাদের সামনে সেই রূপরেখা আজ জজ্বল্যমান।

খেয়াল করে দেখুন ওরা (ইঙ্গ-মার্কিন-ভারত লবি) শুরুই করেছে ইরাক আর আফগানকে দিয়ে। কারন, ইরাক ছিলো মুসলিমদের (আব্বাসীয়) স্বর্নযুগের রাজধানী। এই বাগদাদ থেকেই মুসলিমরা সারা বিশ্ব শাসন করার বুনিয়াদ গড়েছিলো।

আর আফগান ছিলো মধ্য ও দক্ষিন-পূর্ব এশিয়া তথা ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সভ্যতার প্রাণকেন্দ্র। প্রাচীন “ঘৌর” আর “গজনবী” এই আফিগানেই ছিলো একসময়। তাই কট্টরপন্থী “ইহুদি-খৃষ্টান-হিন্দু” জোট এই আফগান আর ইরাককেই সবার আগে ধ্বংস করেছে বা করতে চাচ্ছে।

এরপর এখন তারা ইরান ও পাকিস্তানের দিকে নজর দিয়েছে, একদিন যখন ইরান পাকিস্তানও শেষ হবে তখনও আমরা ঘুমিয়েই থাকবো এই ভেবে যে, আমরা তো ভালো আছি, আমাদের তো কিছুই হয়নি। এটা ইরান, পাকিস্তানের সেই মার্কিনদের মুলা ঝুলানো অভ্যন্তরীণ বিষয়। আস্তে আস্তে গোটা মুসলিম জাতিকে তারা গ্রাস করবে। পৃথিবী থেকে মুসলিমদের নিশ্চিহ্ন করার পাঁয়তারা তারা করছে প্রতিনিয়ত যা আমাদের চক্ষুসম্মুখ হয়েও অগোচর।

তারা লিবিয়াকে ধ্বংস করেছে, সিরিয়াকে ধ্বংস করেছে, ফিলিস্তিনিদের প্রতিনিয়ত মাতৃভূমি থেকে উচ্ছেদ করে হত্যা করা হচ্ছে, দখল করা হচ্ছে।

আফগানিস্তান-ইরাক শেষ করে মেরুদণ্ড ভেঙে দেয়া হলো, চীনাদের দিয়ে উইঘুরদের গৃহবন্দী করে অত্যাচার করা হচ্ছে, পার্লামেন্টে আইন পাশ করে ভারতকে দিয়ে কাশ্মীরীদের স্বায়ত্তশাসনের অধিকার কেড়ে নেয়া হলো।

ইরানকে সেই নব্বই দশকের পরবর্তী সময় থেকে ব্যাবসায়িক নিষেধাজ্ঞা দিয়ে এক ঘরে করে রাখলো,
তুরষ্কে বার বার সেনা বিদ্রোহের পাঁয়তারা কষা হয়েছে গত দুই দশকে, চেষ্টা করা হচ্ছে নিজেদের গোলাম বানিয়ে তাকে কব্জা করতে।

মিশর- তিউনিসিয়া তথা পুরো উত্তর আফ্রিকায় রাজনৈতিক সংকট ও অচলাবস্থা তৈরি করে রাখলো, ইয়েমেনে সিয়া-সুন্নির দ্বন্দ্ব লাগিয়ে খোদ সৌদি আরবকেই লাগিয়ে দেয়া হলো হামলা করে ধ্বংস করার জন্য।

আর সৌদি-আমিরাতকে তো দালাল বানিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের ইঙ্গ-মার্কিন ঘাঁটি সেই বহু পুরোনো কাসুন্দি।

যা-ও কাতার ছিলো কিছুটা প্রতিবাদী সেই কাতারকেও সৌদি-আমিরাত মিত্র দিয়ে শাসিয়ে অর্থনৈতিক অবরোধ দেয়া হয়েছিলো।
ইদানিং আবার একদিকে ভারতে নাগরিকত্বের নামে মুসলিমদের দেশহীন করার পাঁয়তারা চলছে,

অন্যদিকে রোহিঙ্গাদের দমন-পিড়ন চালিয়ে দেশ ছাড়া করে বাংলাদেশের ঘাড়ে রেখে দক্ষিন এশিয়ায় নতুন ইসরায়েল জন্মদেয়ার পরিকল্পনা চলছে।

অথচ আমরা নির্বিকার, আমরা ভালো আছি। এতোকিছুর মধ্যেও আমরা কোন যোগসূত্র পাইনা, আমরা বুঝতে পারিনা সারাবিশ্বের কোথাও মুসলিমরা ভালো নেই, শান্তিতে নেই।
এরপরও আমরা ঘুমিয়েই থাকবো, আর সাথে অলীক কল্পনায় এই ভেবে বিভোর থাকবো যে, আল্লাহ একদিন আসমানী গজব নাজিল করে এসবের প্রতিশোধ নিবেন।

আমরা ভুলে গেছি, আমাদের এক থাকার কথা। ভুলে গেছি বদর-ওহুদ-আর খন্দকের চেতনা। ভুলে গেছি একদিন এই পৃথিবীর বুকে আমরা বীরের জাতি ছিলাম।

লেখক, মাহমুদ সাকী।
শিক্ষার্থী ও সংস্কৃতিক কর্মী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Tags

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close