টপ নিউজমতামত

মানুষতান্ত্রিক সমাজই হোক নারী দিবসের মূলমন্ত্র

নারী অধিকার আদায়ের আন্দোলন নতুন কোন বিষয় নয়। এটির যাত্রা শুরু হয়েছে বহু বছর আগে থেকেই। আজও থামেনি সেই আন্দোলনের স্রোতধারা, বয়েই চলেছে তার আপন গতিতে। আজ থেকে কয়েক দশক আগেও যেমন নারীকে প্রতিটা অধিকার আদায় করে নিতে হয়েছে, এখনও তা-ই করতে হচ্ছে। এ গেল সমাজ নামক পাখির একটি ডানার গল্প।

অন্যদিকে, সমাজের আরেক ডানায় দেখা যাচ্ছে যে এই সমাজই পুরুষকে তার অধিকার পেয়েছে প্রকৃতিগত ভাবেই, জন্মের সাথে সাথেই। পুরুষকে তার অধিকার আদায় করে নিতে হয়নি। আজ থেকে ১৬৩ বছর আগে শুরু হওয়া আন্দোলন আজও চলছে। আজও সমাজে নানাভাবে নারীরা নিপীড়িত ও লাঞ্ছিত হচ্ছে।

নারীরা নিরাপদে চলাফেরা করতে পারছে না। মেয়েরা সন্ধ্যার পর বাড়ি ফিরতে দেরি হলেই পরিবারে শুরু হয়ে যায় উৎকন্ঠা। অথচ একই বাড়ির ছেলে বাড়ি না ফিরলেও সেই উৎকন্ঠা আসে না। আজও নারীকে ন্যায় বিচার লাভের আশায় মানববন্ধন করতে হয় তবুও মেলে না সুষ্ঠু বিচার। নারীর অধিকার, সম-মর্যাদা আদায়ের উদ্দেশ্যে আজ বাংলাদেশসহ সারাবিশ্বে আন্তর্জাতিক নারী দিবস পালিত হচ্ছে। এভাবে আর চলবে কতদিন! কবে শেষ হবে এই অধিকার আদায়ের আন্দোলন! কবে অর্জিত হবে নারী-পুরুষের সম-অধিকার! প্রশ্ন থেকে যায়! পাশাপাশি আরও একটি নতুন প্রশ্নের সৃষ্টি হয়।

নারী আর পুরুষ কি আসলেই সমান? সমান হওয়ার আদৌও কি সম্ভাবনা আছে? সব ক্ষেত্রে তাদের অধিকার কি সমান হবে? সোজা উত্তর হল, না। কোনোদিনও হবে না। কারণ, নারীরা নারীদের মতন আর পুরুষেরা পুরুষদের মতো। প্রকৃতিগতভাবেই তারা আলাদা। কিন্তু, জ্ঞানে-গুণে, বিদ্যা-বুদ্ধিতে নারী-পুরুষের পার্থক্য করা সমীচীন নয়। তাই, নারী পুরুষকে আলাদা না করে একসাথে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত হবে। নারী ও পুরুষকে আলাদা না করে যদি মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা হয় তবেই মানুষের অধিকার অর্জিত হবে। তখন সেটা না হবে নারীর অধিকার, না হবে পুরুষের অধিকার। সেটা হবে মানুষের অধিকার। তখনই অর্জিত হবে সকলের সমান অধিকার।

এখানেও একটা ভাবনার বিষয় আছে। সেটি হলো, সব দোষ কি তাহলে পুরুষ সমাজের? পুরুষসমাজ কি নারীদের অধিকার থেকে বঞ্চিত করে? তারা কি চায় না নারীকে সমান অধিকার দিতে? এখানে হ্যাঁ বা না কোনটিই সরাসরি বলা বস্তুত কঠিন। অপরদিকে, নারীরা কী চায়? নারীরা কি নিজেদের অধিকার নিয়ে সচেতন? নারীরা কি চেয়েছে পুরোপুরি স্বাধীন হতে? নারীরা কি কখনো নিজেদের নারী না ভেবে মানুষ ভেবেছে?

একবিংশ শতাব্দীতে এসেও দেখা যায় যে নারীরা কোনো না কোনো ভাবে পুরুষের ওপর নির্ভরশীল। সেটা কখনো মানসিক, কখনো শারীরিক আবার কখনো অর্থনৈতিক। যদিও হাল যুগে এসে কিছুটা অর্থনৈতিক মুক্তির দেখা মিলেছে, এখনো মিলেনি মানসিক দাসত্ব থেকে মুক্তি। এর খুব সাদাসিধা উদাহরণ হল, নারীরা নিজেদের ফিটফাট রাখে অন্যের চোখে সুন্দর দেখানোর জন্য। লোকে কি বলবে এই ভেবেই সময় শেষ করছে, নিজের স্বপ্নকে বাস্তবায়ন করার সময় পাচ্ছে না।

বর্তমানে অন্যের চোখে সুন্দর দেখানোটা ভয়ংকর বিভৎস রূপ ধারণ করেছে। স্কিনে এতো দাগ কেন! তুমি এতো মোটা, একটু ডায়েট করলেও পারো! চোখের নিচে কালি ফেলেছো! এতো কালো মেয়ে কে বিয়ে করবে! একটু তো ফর্সা হওয়ার চেষ্টা করতে পারো! চেহারা খারাপ হলে বিয়ে হবে না!- এসব কথা শুনতেই দিনের বেশিরভাগ সময় নষ্ট করে ফেলছে। এসব শুনে শুরু করে নিজেকে অন্যের চোখে সুন্দর করার লড়াই এবং তার জন্য পার্লার, মেকআপ বাধ্যতামূলক।

অনেকে বলে এসব তারা নিজেদের জন্য করে। কিন্তু না, এসব পুরুষের চোখে সুন্দর দেখানোর জন্য করে। এমনকি কিছু শিক্ষিত নারীকেও বলতে দেখা যায়, ২৪ পেরুলে ভালো বিয়ে হবে না! ক্যারিয়ার দিয়ে হবে কি! শেষে তো রান্নাঘরেই ঢুকতে হবে! সভ্য সমাজের সুশীল নারীরাও বলে, স্বামীর কথাই শেষ কথা! দুজন চাকরিজীবী স্বামী-স্ত্রীর সংসারে দেখা যায় অফিস শেষে স্বামী রেস্ট করে আর স্ত্রী যায় রান্নাঘরে।

নারীদের এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ যেমন কন্ট্রোল করতে চায় তেমনি একবিংশ শতাব্দীর নারী হয়েও অধিকাংশ নারীরাও স্বেচ্ছায় কন্ট্রোলড হয়। যারা কন্ট্রোলড হতে চায় না বরং এসবের প্রতিবাদ করে এবং অধিকার নিয়ে কথা বলে তারা এই সমাজে নারীবাদীর তকমা পায়।

শোনা যায়, নারীরা বদলালে বদলে যাবে পৃথিবী। এসব কথা শুনতেই ভালো লাগে, বাস্তবে এর কোনো ভিত্তি নেই বললেই চলে। কারণ, নারীরা নিজেদের স্বাধীন ভাবলেও এই পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সহজে তাদের কর্তৃত্ব ছাড়বে না।

কর্মক্ষেত্রে সমান সুযোগ সুবিধা দিলেও ঘরের ভেতর নারী আজও দাসী, ভোগ্যপণ্য। কর্মক্ষেত্রে কাজের ঘন্টা হিসেবে আসলেও ঘরের কাজ কোনো হিসেবের মধ্যেই আসে না। যদি তা ধরা হয় তাহলে দেখা যাবে একজন নারী প্রতিদিন পুরুষের চেয়ে ৩০ মিনিট বেশী কাজ করে। এটা গেল উন্নত দেশের চিত্র। উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে তা ৫০ মিনিট। শুধু এ ক্ষেত্রে নয় কাজের বাজারে নারীদের জন্য থাকে চুক্তিভিত্তিক শর্ত। সাথে নেই সামাজিক নিরাপত্তা। কাজের বাজারে মজুরি কমিয়ে রাখার জন্য মার্কসের তত্ত্ব আজও প্রাসঙ্গিক। সস্তা শ্রমের যোগানদার হিসেবে ব্যবহৃত হয় মেয়েরাই।

আমাদের দেশের পোশাক শিল্পের দিকে তাকালে তার স্পষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়।গত দুই দশকে নারীদের শিক্ষাগত যোগ্যতা বাড়লেও তার কোনো প্রতিফলন নেই কর্মক্ষেত্রে। একজন নারীকে ধর্ষণ করলে সমাজের চোখে সেই নারী ধর্ষিতা হয় অথচ ধর্ষকের বিচার হয় না। বইপুস্তকে বলা হয়, দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি বাংলাদেশের স্বাধীনতা। ইজ্জত কেন বলা হয় তা বোধগম্য নয়। ইজ্জত গেছে লম্পট পাকিস্তানী ধর্ষকদের। সম্মান যদি হারিয়ে থাকে তবে তাদের হারিয়েছে যারা ধর্ষক। দুই লক্ষ মা-বোনের ইজ্জত আমরা হারাইনি। নারীর সম্মান তার শরীরে থাকে না। সম্মান তারাই হারায় যারা নির্যাতন করে, যারা অন্যায় করে। যারা অত্যাচারিত হয় তাদের সম্মান হারায় না।

একুশ শতকের আধুনিক বিশ্ব নারীদের আজও নিরাপত্তা দিতে পারে নি। মুক্ত বাণিজ্যের জগতে মেয়েরা আজও পণ্য। বহুযুগের লালিত এই দাসত্ব থেকে মুক্তি প্রয়োজন। মুক্তির জন্য প্রয়োজন মানসিক পরিবর্তন। মানবজীবনের মর্যাদাবোধ প্রতিষ্ঠা করার মধ্য দিয়েই আসবে নারীমুক্তি৷ মানসিক দাসত্ব ভয়ংকর খারাপ জিনিস। এই দাসত্বের শিকল ভাঙ্গতে হবে৷ নারীদের সচেতন হতে হবে, স্বাধীন হতে হবে। জ্ঞান অর্জনের পাশাপাশি আত্মবিশ্বাস বাড়াতে হবে। বাড়াতে হবে মনের দৃঢ়তা, প্রতিবাদী হতে হবে অন্যায়ের ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে। তবেই হয়তো অর্জিত হবে কাঙ্ক্ষিত মুক্তি। থামবে তথাকথিত সমঅধিকার আদায়ের আন্দোলন। প্রতিষ্ঠিত হবে মানুষতান্ত্রিক সমাজ। মোরা নারী-পুরুষ বিভেদ নই, সবাই মিলেই মানুষ হই- এটাই হোক এবারের নারী দিবসের মূলমন্ত্র।

লেখক: পূর্বা সাহা
শিক্ষার্থী, বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়
ও প্রতিনিধি, দৈনিক আলোকিত ভোর।

Tags

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close