পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ফিচারশিক্ষা

মুজিব বর্ষে মুজিবনগর ভ্রমণ

১৩ মার্চ ২০২০। মতিহারের সবুজ চত্বরে প্রভাতে যখন প্রকৃতির স্নিগ্ধতা বিরাজ করছে তখন এই মনোরম পরিবেশে সিরাজী ভবনের সামনে উপস্থিত হলো ফোকলোর পরিবার। সবাই অনেক আনন্দিত। কারণ অনেকদিন পরে ডিপার্টমেন্ট থেকে দূরবর্তী কোথাও শিক্ষাসফরে যাওয়া হচ্ছে।

অন্যদের চেয়ে আমি বোধহয় একটু বেশিই উদগ্রীব ও আবেগাপ্লুত ছিলাম। কারণ দীর্ঘ চার বছরে কখনো কল্পনাও করতে পারিনি যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আকাশী নীল-সাদা বাসে করে মুজিবনগর যাওয়ার সৌভাগ্য হবে। পুরো যাত্রাপথে আমি এই বিষয়টি চিন্তা করেই অনেক রোমাঞ্চিত ছিলাম। তাছাড়া ইতিহাস-প্রিয় শিক্ষার্থী বলে ঐতিহাসিক স্থানগুলোর প্রতি আমার আলাদা একটা ভাললাগা কাজ করে।

তিনটি বাসের মধ্যে আমরা যে বাসটাতে ছিলাম সেখানে অনেক নবীন শিক্ষার্থী ছিল। তারা যখন নাচ-গানের মাধ্যমে যাত্রাপথকে উপভোগ্য করে তুলেছিল তখন আমি যেন তাদের মধ্যে চার বছর আগের আমিকে খুঁজে পেয়েছিলাম। দীর্ঘ ভ্রমণ শেষে আমরা যখন মুজিবনগর পৌঁছেছিলাম তখন কোনোপ্রকার ভ্রমণ-ক্লান্তি আমাদের আনন্দকে ম্রিয়মাণ করতে পারেনি। মুজিবনগর গিয়ে পুরো কমপ্লেক্সটি ভাল করে দেখার জন্য আমরা ছোটো ছোটো দলে বিভক্ত হয়েছিলাম। আমরা মাস্টার্সের শিক্ষার্থীরা একসাথে ছিলাম। আমাদের মধ্যে সায়েম ও রাকিব স্থানীয়। ওরা আমাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।

প্রথমেই আমরা গেলাম মুজিবনগর শহীদ মিনারে। এখানে ১৯৭১ সালে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার শপথ গ্রহণ করেছিল। সেই স্মৃতিকে অম্লান করে রাখতেই শহীদ মিনারটি নির্মাণ করা হয়। স্থাপতি সোহেল তানভির এটি নির্মাণ করেন। স্মৃতিসৌধটি ২৩ টি ত্রিভূজাকৃতি দেয়ালের সমন্বয়ে গঠিত যা বৃত্তাকার উপায়ে সারিবদ্ধভাবে সাজানো রয়েছে। ২৩ টি দেয়াল (আগস্ট ১৯৪৭ থেকে মার্চ ১৯৭১)- এই ২৩ বছরের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথম দেয়ালটির উচ্চতা ৯ ফুট ৯ ইঞ্চি এবং দৈর্ঘ্য ২০ ফুট। পরবর্তী প্রতিটি দেয়ালকে ক্রমান্বয়ে দৈর্ঘ্য ১ ফুট ও উচ্চতা ৯ ইঞ্চি করে বাড়ানো হয়েছে। যা দ্বারা বুঝানো হয়েছে বাংলাদেশ তার স্বাধীনতার জন্য ৯ মাস ধরে যুদ্ধ করেছিল। শেষ দেয়ালের উচ্চতা ২৫ ফুট ৬ ইঞ্চি ও দৈর্ঘ্য ৪২ ফুট। প্রতিটি দেয়ালের ফাঁকে অসংখ্য ছিদ্র আছে যেগুলোকে পাকিস্থানি শাসক গোষ্ঠীর অত্যাচারের চিহ্ন হিসেবে প্রদর্শন করা হয়েছে। এর ভূমি থেকে ২ ফুট ৬ ইঞ্চি উঁচু বেদীতে অসংখ্য গোলাকার বৃত্ত রয়েছে যা দ্বারা ১ লক্ষ বুদ্ধিজীবির খুলিকে বোঝানো হয়েছে।

ভূমি থেকে ৩ ফুট উচ্চতার বেদীতে অসংখ্য পাথর রয়েছে যা দ্বারা ৩০ লক্ষ শহীদ ও মা-বোনের সম্মানের প্রতি ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতা ও স্মৃতিচারণা প্রকাশ করা হয়েছে। পাথরগুলো মাঝখানে ১৯টি রেখা দ্বারা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্থানের ১৯টি জেলাকে বুঝানো হয়েছে। এটির বেদীতে আরোহণের জন্য ১১টি সিঁড়ি রয়েছে যা দ্বারা মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে সমগ্র বাংলাদেশকে যে ১১টি সেক্টরে বিভক্ত করা হয়েছিল তা বুঝানো হয়েছে। উত্তর পাশের আম বাগান ঘেঁষা স্থানটিতে মোজাইক করা আছে যা দ্বারা বঙ্গোপসাগর বোঝানো হয়েছে। বঙ্গোপসাগর যদিও বাংলাদেশের দক্ষিণে, কিন্তু শপথ গ্রহণের মঞ্চটির সাথে স্মৃতিসৌধের সামঞ্জস্য রক্ষার জন্য এখানে এটিকে উত্তর দিকে স্থান দেয়া হয়েছে। স্মৃতিসৌধের মূল ফটকের রাস্তাটি মূল স্মৃতিসৌধের রক্তের সাগর নামক ঢালকে স্পর্শ করেছে।

এখানে রাস্তাটি ভাষা আন্দোলনের প্রতীকী অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে। স্মৃতিসৌধের পশ্চিম পাশে প্রথম দেয়ালের পাশ দিয়ে শহীদের রক্তের প্রবাহ তৈরি করা হয়েছে যাকে রক্তের সাগর বলা হয়। লাল মঞ্চ থেকে যে ২৩টি দেয়াল তৈরি করা হয়েছে তার ফাঁকে অসংখ্য নুরি-পাথর দ্বারা মোজাইক করে লাগানো হয়েছে। যা দিয়ে ১৯৭১ সালের সাড়ে সাত কোটি ঐক্যবদ্ধ জনতাকে প্রতীক আকারে উপস্থাপন করা হয়েছে। ১৯৭১ সালের ১৭ই এপ্রিল বাংলাদেশের অস্থায়ী সরকার যে স্থানে শপথ গ্রহণ করে ঠিক সেই স্থানে ২৪ ফুট দীর্ঘ ও ১৪ ফুট প্রশস্ত সিরামিকের ইট দিয়ে একটি আয়তকার লাল মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। এর অবস্থান মুজিবনগর স্মৃতিসৌধের ভিতরে মাঝখানে।

এরপর আমরা গেলাম মানচিত্র দেখতে। মানচিত্রে ১৯৭১ সালের সময়ের বাংলাদেশ ভূখণ্ডকে তুলে ধরা হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন সেক্টরের অবস্থান বাংলাদেশের মানচিত্রে প্রদর্শন করে মানচিত্রটি মুক্তিযুদ্ধ স্মৃতি কমপ্লেক্সের অভ্যন্তরস্থ মূল আঙ্গিনায় স্থাপন করা হয়েছে। সুদৃশ্য এ মানচিত্রটি মুক্তযুদ্ধকালীন বিভিন্ন সেক্টরের অবস্থান ও উল্লেখযোগ্য ঘটনাবলী সম্পর্কিত এক প্রমাণ্যচিত্র। আগেই বলেছি যে আমি একজন ইতিহাস-প্রিয় মানুষ। তাই এমন মানচিত্র পেয়ে স্বভাবতই আমি ভাল করে দেখার চেস্টা করলাম। কিছুক্ষণ পর দেখি যে আমার বন্ধুরা কেউ আমার সাথে নেই। তারা যে কখন বের হয়ে গিয়েছে তা আমি বুঝতেই পারিনি। তাই আমি ভালভাবে না দেখেই মানচিত্র-কমপ্লেক্স থেকে বের হয়ে বাইরে আনমনে ঘুরতেছিলাম। ইতোমধ্যে দেখি একটি ব্যাটারি চালিত ভ্যানে করে শিক্ষকরা সীমান্ত-পরিদর্শনে যাচ্ছেন। তারা আমাকে তাদের সাথে যাওয়ার কথা বলতেই আমি সুযোগটি লুফে নিলাম। বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তবর্তী একটি যায়গাকে পর্যটন এলাকা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে। সীমান্তে গিয়ে আমি খুব পিপাসার্ত হয়ে পড়ি। তাই একগ্লাস বেলের শরবত পান করতেই মনে হলো যেন স্বর্গীয় সুধা পান করেছি। সীমান্ত পরিদর্শন শেষে আমরা ভ্যানে করে পুনরায় মুজিবনগর কমপ্লেক্স যাই। যাত্রাপথে ফারজানা ম্যাম (ফারজানা রহমান) আমাকে তার কাছে থাকা পিয়াজুর পিয়াজ ভাজা খেতে দিয়েছিলেন, পিয়াজু ইতোমধ্যে শেষ হয়ে গিয়েছিল। এই জিনিসটি আমার ভীষণ প্রিয়, কিন্তু ম্যামের সেটা কোনোভাবেই জানার কথা না। মুজিবনগর কমপ্লেক্সে গিয়ে আমরা ভাষ্কর্যগুলো পরিদর্শন করি। মুক্তিযুদ্ধকালীন বিভিন্ন স্মৃতি-নিদর্শন এসব ভাস্কর্যের মাধ্যমে তুলে ধরা হয়েছে। মোবাররা ম্যাম (অধ্যাপক মোবাররা সিদ্দীকা) ইতিহাসের দৃষ্টিকোণ থেকে এগুলো নিয়ে আলোচনা করছিলেন। এরপর আমরা বাংলাদেশের মানচিত্র দেখতে গিয়েছিলাম। মানচিত্র দেখার জন্য এখানে দুটি ওয়াচ টাওয়ার করা হয়েছে। মানচিত্রের দুপাশে টাওয়ার দুটির অবস্থান। মানচিত্রের দক্ষিণমুখী টাওয়ারে উঠলাম। এখান থেকে আমার নিজ এলাকা বৃহত্তর বরিশাল খুব কাছ থেকে দেখা যাচ্ছিল। হঠাৎ শুনি ফারজানা ম্যাম গুণগুনিয়ে গান করছিলেন- “ওরা আসবে চুপি চুপি, যারা এই দেশটাকে ভালবেসে দিয়েছিল প্রাণ।” এই গান শুনে তারিক স্যারও (অধ্যাপক মোস্তফা তারিকুল আহসান) তার সাথে সুর মিলিয়েছিলেন। তাদের এই গান শুনে আমার মনের মধ্যে অন্যরকম আবহ সৃষ্টি হয়েছিল, নিজের অজান্তেই যেন আমিও তাদের সাথে যোগ দিয়েছিলাম। কিছুক্ষণ পর জাহিদ স্যার (ড. রওশন জাহিদ) আমাদের সবাইকে বাদাম দিয়েছিলেন। ফলে পরিবেশটা হালকা হয়ে যায়।

এরপর আমরা ভ্যানে করে আমাদের পিকনিক স্পটে চলে যাই, সেখানে বিশ্রাম ও খাবারের আয়োজন করা হয়েছিল। খাবার শেষে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন ছিল। সবাই অনেক মজা করেছে।

পরিশেষে সায়েম আমাকে একটা পান খেতে দিয়েছিল যা পারভেজ নিয়ে নেয়, এজন্য পারভেজের প্রতি তিরস্কার। মনিকা আমার সাথে ছবি তুলেনি বলে তাকেও তিরস্কার জানাচ্ছি। আহসানকে ধন্যবাদ পুরোসময়টুকুতে সাহায্যপূর্ণ মনোভাবের জন্য। জুইকে দুঃখিত, কারণ আমি তাকে ছবি তুলতে দেইনি বলে। তারেককে ধন্যবাদ তার টিস্যু পেপারটির অর্ধেক আমার সাথে শেয়ার করার জন্য। মুস্তাফিজ অনেক অমায়িক ছিল। আরনি তার খাবার আমার সাথে শেয়ার করতে চেয়েছিল, তাকেও অনেক অনেক ধন্যবাদ। পুরো যাত্রাপথে বৃষ্টি সঙ্গ দিয়েছিল, তার কথা বলাই বাহুল্য। এই প্রোগ্রাম আয়োজনের সাথে অনেক ছোটভাইকে প্রত্যক্ষভাবে সম্পৃক্ত হতে দেখেছি। তোদের জন্য অনেক অনেক ভালবাসা।

সন্ধ্যার আগেই আমরা ক্যাম্পাসের উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিলাম। ফিরতি পথে আম্রকাননের সাথে আমাদের স্বাধীনতার কি যেন এক সম্পর্ক খুজতেছিলাম। অনেকক্ষণ পর বুঝতে পারলাম আমাদের স্বাধীনতার সাথেই শুধু নয়, পরাধীনতার সাথেও আম্রকাননের সম্পর্ক আছে। কেননা ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন সংগঠিত হওয়া পলাশীর যুদ্ধে মীর মদন এবং সিনফ্রের সৈন্যরা যখন ইংরেজদের কচুকাটা করছিল তখন ইংরেজ সৈন্যরা সেখানকার আম্রকাননেই আশ্রয় নিয়ে প্রাণ রক্ষা করেছিলেন। সেই যে বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল তার প্রায় ২১৩ বছর পর বাঙালিরা বৈদ্যনাথতলার আরেক আম্রকাননে স্বাধীনতার রাঙা প্রভাতকে আনার শপথ নিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে আমরা বাঙালিদের একটি স্বাধীন ভাষাতাত্ত্বিক রাষ্ট্র বাংলাদেশ পেয়েছি। তাই বৈদ্যনাথতলার বর্তমান নামকরণ করা হয়েছে মুজিবনগর।

লেখক- সিদ্ধার্থ সজল,
শিক্ষার্থী- ফোকলোর বিভাগ,
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

Tags

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close