মুজিববর্ষ

বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে একদিন

তখন রাজনীতি করি না। বাবা কফিল উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে মুক্তিযুদ্ধের পর ওপার থেকে দেশে ফিরে ব্যবসায় মগ্ন। নতুন বাংলাদেশ, তখন নানান সমস্যা ছিল, সেই সমস্যা জর্জরিত একটি ক্রান্তিলগ্নে দেশে খাদ্যের অভাব ছিল যথেষ্ট। সেই খাদ্যাভাবের একটি দিনে হঠাৎ করে মওলানা ভাসানী একটি অনশন কর্মসূচি দিলেন।

মওলানা ভাসানী আমাকে অনুরোধ জানালেন, আমি যেন তাঁর চিকিৎসক হিসেবে থাকতে রাজি হই। একজন বয়োজ্যেষ্ঠ নেতার এই অনুরোধ আমি রক্ষা করেছি এবং সেই সময় যত দিন অনশন ছিল, আমাকে তাঁর পাশে যেতে হয়েছে। আমি তাঁর রক্তচাপ মাপতাম, শরীরের তাপমাত্রা, পুষ্টি-অপুষ্টি কী হয়েছে সেগুলো দেখতাম এবং রেকর্ড করতাম। তিনি অনশন করছিলেন মতিঝিলের একটি ঘরে, বোধহয় এটা দলীয় কার্যালয় ছিল।

তাঁর দলীয় সঙ্গীদের মধ্যে তরুণ নেতারা অনেকেই ছিলেন। তার মধ্যে বিশেষ করে কাজী জাফর আহমেদের কথা আমার মনে পড়ে। ওই দিনে ৫০ থেকে ৮০ জন ছাত্র ধরনের অনুসারী ছিল। প্রায় সব সময় থাকতেন। এদের অবস্থান বেশির ভাগই নিচের তলায় এবং রাজপথে থাকত। গেটের সামনে আমি যখন যেতাম প্রায়ই সেখানে কাজী জাফর সাহেবকে দেখতাম। তারা দু-তিনজন সঙ্গী ছিল মওলানা ভাসানীর। তিনি একটা কাঠের চৌকিতে শুয়ে থাকতেন।
বোধহয় দ্বিতীয় দিন কি তৃতীয় দিন হবে, হঠাৎ খবর এলো বঙ্গবন্ধু তাঁকে দেখতে আসবেন। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার আগেও কয়েকবার দেখা হয়েছে। তবু আমার আরেকটা মস্ত বড় সুযোগ হবে আর একবার কাছে থেকে দেখা। সে হিসেবে আমি একটু আগেই সেখানে গেলাম এবং সেদিনও মওলানা ভাসানীর শরীর পরীক্ষা করে সবকিছু লিখে রাখলাম। যথাসময়ে বঙ্গবন্ধু এলেন, দীর্ঘদেহী, সুপুরুষ, চশমাধারী মানুষটি সাদা পাঞ্জাবি আর একটা পায়জামা পরে এসেছিলেন। যে পোশাকে তাঁর ব্যক্তিত্ব সবচেয়ে বেশি বিকশিত হতো। যে পোশাকে বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে সব সময়ই চেনে, সেই পোশাকে তিনি ধীরে ধীরে ঘরে প্রবেশ করলেন। আমরা সবাই তখন উঠে দাঁড়ালাম। আমার দিকে তাকিয়ে প্রথমে তিনি মৃদু হাসলেন এবং বললেন, ‘ডাক্তার সাহেব কেমন আছেন?’ তিনি আমাকে বিশেষভাবে চিনতেন কারণ, আমার বাবা কফিল উদ্দিন চৌধুরী রাজনীতিবিদ ছিলেন। আমার বাবা তখন অসুস্থ ছিলেন। তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন।

এর আগে বঙ্গবন্ধু আমাদের মগবাজারের বাসায় গিয়েছিলেন। আমাদের বাসার বাগানে বসে বাবার সঙ্গে আমার স্ত্রীর হাতে তৈরি চা-নাশতা খেয়েছেন। সেই গল্প আমার স্ত্রী এখনো করেন এবং গর্বের সঙ্গেই করেন। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে চৌকির খুব কাছে গিয়ে মওলানা ভাসানীর হাতে হাত রেখে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘হুজুর! আপনি আমার সঙ্গে এমন করেন ক্যান?’ ভাসানী চোখ মেলে বঙ্গবন্ধুকে বললেন, ‘মুজিব! তোমার সঙ্গে না করলে কার সঙ্গে করব, তোমাকে এত ভালোবাসি, স্নেহ করি। তুমি এখন দেশ চালাও। দেশে যে দুর্ভিক্ষ চলছে সেটা কি তুমি দেখো না!’

বঙ্গবন্ধু হাসলেন। তাঁর সেই অদ্ভুতসুন্দর, সহজ-সরল, মন জয় করা হাসি হেসে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘হুজুর! আপনি যা বলেন আমি তো তাই করি, এ কথা কেন বলছেন!’ মওলানা সাহেব বললেন, ‘দেশে একটা দুর্ভিক্ষ চলছে, তুমি তো জানো। তুমি যদি আজকে খিচুড়ি রান্না করে নিয়া আসতা তোমার এবং আমার জন্য, তাহলে একসাথে দুজনে বসে খাইতাম। সেইটা হইতো তোমার কাজের মতো কাজ।’

বঙ্গবন্ধু আবার হাসলেন এবং বললেন, ‘আমি তো সবার মুখে খাবার দিয়ে তারপর আপনার আর আমার কথা ভাবব, তাই না?’ এভাবে তাঁরা দুজন আলাপ-আলোচনা করতে লাগলেন।

গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে বঙ্গবন্ধু মওলানা ভাসানীর সঙ্গে কথা বলছিলেন। আমি দেখে অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। কারণ, সেখানে কোনো তিরস্কারের ভাষা নেই, কোনো অশ্রদ্ধার ভাষা নেই। যেন বহুদিনের পরিচিত গুরু-শিষ্যের মতো সম্পর্ক এবং একজন ঐতিহাসিক প্রধানমন্ত্রী। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস যাঁকে ছাড়া লেখা যায় না, সেই মানুষটি এত সুন্দরভাবে সহজভাবে কথা বলছেন, সরল শিশুর মতো। সে বিষয়টি আমি এখনো ভুলতে পারিনি। আমার স্মৃতি ও মনের কোঠায় এটা চিরকালের জন্য ছবি হয়ে আছে।

‘যাহার অমরস্থান প্রেমের আসনে/ক্ষতি তার ক্ষতি নয়, মৃত্যুর শাসনে।’ (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)। বিশ্বকবি যা লিখেছেন বহু বছর আগে তা আসলে খুব কম লোকেরই প্রাপ্য হয়। মানুষকে ভালোবেসে দেশকে ভালোবেসে তাঁরা এমন ওপরে উঠে আসেন যা মৃত্যুর পর তাঁর কোনো ক্ষতি করতে পারে না। মানুষের হৃদয়ে তাঁর যুগ যুগ অবস্থান নিশ্চিত হয়ে থাকে।

বঙ্গবন্ধু সেই অমরস্থানের অধিকারী একজন মানুষ। সার্থক মানুষ হতে হলে অনেক গুণের প্রয়োজন। সার্থক রাজনীতিবিদ হতে হলে তার আরও অনেক বেশি চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। বঙ্গবন্ধু অসাধারণ রাজনীতিবিদ নন বরং সব মিলে তাঁর একটা অসাধারণ ক্যারিশমা সৃষ্টি করতে পেরেছিলেন। মানুষ তাঁকে বঙ্গবন্ধু নামে ডাকত। এটা অনেক ভালোবাসা, অনেক স্নেহ, অনেক বিশ্বস্ততা এবং আপনজনের প্রতিশ্রুতি।

বঙ্গবন্ধুর জীবনের দিকে তাকালে প্রথম যে চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য চোখে পড়ে সেটা তাঁর সাহস। বাংলাদেশের ইতিহাসে এমন সাহসী রাজনীতিবিদ বিরল। দ্বিতীয়ত, বঙ্গবন্ধুর সাংগঠনিক ক্ষমতা ছিল অসাধারণ। তিনি বিদ্যুৎবেগে সারা দেশে যেভাবে সংগঠন তৈরি করেছিলেন তা অসাধারণ এবং অনুকরণযোগ্য।

অসাধারণ বক্তা বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠস্বরে ছিল আল্লাহ-প্রদত্ত আকর্ষণ-ক্ষমতা। মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেত শ্রোতারা। তাঁর বক্তব্য ছিল ঋজু, কণ্ঠস্বর ছিল জাদুময়। মানুষকে শেষ পর্যন্ত ধরে রাখা এবং সন্তুষ্ট করার অসাধারণ ক্ষমতা। রেসকোর্স ময়দানে ৭ মাচর্, ১৯৭১ সালের ভাষণটি বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হয়েছে ইউনেস্কো।

দেশপ্রেম ছিল তাঁর আসল আদর্শ। মাটি ও মানচিত্রকে ভালোবাসা তিনি তাঁর চিন্তা-চেতনা এবং অস্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছিলেন। এজন্যই দেশপ্রেমের সংজ্ঞায় শুধু মানচিত্র নয়, দেশের প্রতিটি শোষিত মানুষকে বঙ্গবন্ধু ভালোবাসতেন অন্তর দিয়ে। সেজন্যই তাঁর ‘অমরস্থান প্রেমের আসনে’ চিরস্থায়ী হয়ে গেল।জীবন বাজি রেখে পরিবার-পরিজনের স্বার্থ ভুলে গিয়ে নিঃস্বার্থ রাজনীতির বিরল ইতিহাস সৃষ্টি করে গেলেন এই ক্ষণজন্মা পুরুষ। ক্ষমতা ছিল তাঁর রাজনীতি ও জীবনের বড় অংশজুড়ে। এ ক্ষমতার অপব্যবহার না করে তিনি শ্রদ্ধার রাজনীতিতে বিশ্বাস করতেন। একদিকে তিনি তাঁর অসংখ্য রাজনৈতিক নেতা-কর্মীর প্রতি যেমন উদার ও স্নেহশীল ছিলেন তেমনি তিনি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বীদের প্রাপ্য শ্রদ্ধা দিতেও কুণ্ঠিত হতেন না। তাঁর ক্ষমাশীলতায় তিনি অজস্র মানুষকে ক্ষমা করে যান।

ছোট একটি রচনায় বঙ্গবন্ধুর এই চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের সব তুলে ধরা সম্ভব নয়। দেশের মানুষকে তিনি যেমন ভালোবেসেছিলেন তেমনি দেশের মানুষও তাঁকে ভালোবেসেছিল। প্রমাণিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের সময় লাখ লাখ মা-বোনসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষ তাঁর মঙ্গলের জন্য আল্লাহর কাছে মোনাজাত করেছেন রোজা রেখে। বাংলাদেশের মানুষ তাঁকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছে।

লেখক: অধ্যাপক ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রপতি, বাংলাদেশ

Tags

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
You cannot copy content of this page
Close
Close