পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়

মহামারী করোনায় কেমন আছে ক্যাম্পাসের মুখগুলো?

মনীষীদের কথায় আছে-(Extravagant hopes lead to complete disappointed) কথাটি বুঝতে পারলেও কখনো উপলব্ধি করিনি কিন্তু এখন সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি। ক্যাম্পাসের লাইফে প্রতিটি শিক্ষার্থীর একটা টান থাকে এদের মধ্যে যারা হলে থাকে এদের আকর্ষনটা একটু আরো বেশীই থাকে। হলের প্রতিটি শিক্ষার্থীর অগোছালো একটা সংসার থাকে। কেউ একজন তাদের রুমে গেলেই বুঝতে পারে। করোনার জন্য যেদিন থেকে হল বন্ধ হবে সেদিন আব্বু আম্মুর ফোনের কারনে ভোর ৬ টায় হল থেকে বাহির হলাম নীড়ের উদ্দেশ্য। তবে মন হইতে সাড়াদেয়নি চলে যাবার জন্য। কারন আমি প্রতিবারই ক্যাম্পাস ছুটি হলেও হল খোলাথাকা পর্যন্ত থাকতে চেষ্টা করি কিন্তু এবার করোনা(Covid-19)মহামারীর জন্য আগেই চলে যেতে হচ্ছে । মনে মনে ভাবলাম ১৮- ৩১তারিখ পর্যন্ত কয়েকটা দিন বন্ধু সাকির কাজলা বা মেহেরচন্ডীতে সাগরের মেসে থাকবো, কিন্তু সবাই একই নৌকার যাত্রী ছিলাম। কিছু উপন্যাস ও বই আর কিছু ড্রেস নিয়ে ১৮ তারিখেরই ভোরেই বাড়ির উদ্দেশ্য রওনা দিলাম সাগরদাঁড়ি ট্রেনে। এদিকে ধীরে ধীরে করোনার ভয়াবহতা বেড়েই চলেছে। বাড়ি পৌঁছে ভেবে দেখলাম প্রায় ৫ মাস পর রাজশাহী থেকে বাড়ি এসেছি। কিন্তু এই ছুটিতে কিছু টার্গেট নিয়ে বাড়ি থেকে এসেছি সেগুলো পূর্ণ হতে এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। এমন অবস্থা যে সব বিষয় গুলো গলায় এসে আটকে গেছে। করোনার ভয়াবহতা চিন্তা করে নিজেকে লকডাউন বা কোয়ারেন্টাইনে নয়‌ বরং আইসোলেশনে নিয়ে নিলাম। গ্রামে এসেই এই মহামারী সম্পর্কে গ্রামের মানুষকে সচেতনতা আনার জন্য আমরা যারা বাইরে পড়াশোনা করি ও এলাকার কিছু পরিচিত মুখ’কে নিয়ে বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে অবহিত করি এবং মাস্ক, লিফলেট বিতরন, কিছু খাদ্যদ্রব্যের ব্যবস্হাসহ মহামারী কালীন সময়ে যেন আমাদের কে অর্তনৈতিক মন্দায় পড়তে না হয় এজন্য তাদের কে বিভিন্ন পরমর্শ দেয়ার চেষ্টা করি সবাই মিলে। বিষয়টি অনেকে ভালভাবে নিলো
কিন্তু গ্রামের কিছু লোকজন এসবের কোন ভ্রুক্ষেপ করে না। এর মধ্যেও কয়েকজনের সাথে কথা বলে বুঝাতে পারলাম এদের শরীরে যেন বাঘের রক্ত বইছে। কেউ আবার এতো ধার্মিক হয়েছে যে করোনা সম্পর্কে কিছু বললেই, আল্লাহর উপর তোমার বিশ্বাস নাই? রোগ দিয়েছেন যিনি তিনিই ভালো করবেন(সচেতনতা ব্যতীত) তোমার ঈমান নাই? এসব বলে দিচ্ছে অথচ মাঝে মাঝে সে নিজেই ভুলে যায় মুসলিম উম্মার কাবা বা পশ্চিম কোন দিকে। এরপর নিজেকে কিছু কাজ থেকে সংবরন করে নিলাম।কারন বাংগালীকে বোঝায় কে তারা এক একটা দার্শনিক ;কে তাদের গোড়ামী তত্ত্ব খন্ডন করবে?এরপরও চেষ্টা করেছি কিছু অসচ্ছল পরিবারের পাশে দাঁড়াতে আমরা সবাই মিলে। এরপর নিজের স্বকীয়তা বজায় রাখার জন্য পড়াশোনা করার চেষ্টা করছি, নিয়মিত কিছু লেখার চেষ্টা করসি করছি, ধর্মীয় ইবাদত তথা নামাজ পড়া এবং কুরআন পড়াটা শিক্ষতে শুরু করি এবং অনেকটা আয়ত্তে আনতে পেরেছি মহান আল্লাহর ইচ্ছাই ও অন্যান্য কাজ করার পাশাপাশি বাড়ির পাশের কিছু ছোট বাচ্চাদের পড়াইতেছি এবং বাবা-মায়ের সাথে সময় কাটাচ্ছি। কিন্তু কষ্টটা তখনই হয়, দিন শেষে যখন বিছানায় শুয়ে পড়ি। এত বড় রুম অথচ আমি একা যেখানে হলের রুমে হয়তো ৪ রুমমেট(রিংকু, এনা,হাবিব) দের সাথে মিলে লেখাপড়া, আড্ডা, স্পেশাল কোনদিনে স্পেশাল সব আইটেম রান্না করে সময় কাটিয়েছি । মনে পড়ে হলের ঐ ছোট্ট খাট, আমার জন্য ওটাই যথেষ্ট।ক্যাম্পাসের জোহা চত্বর, পশ্চিম পাড়া, ইবলিস চত্তর আর প্যারিস রোড় সবসময় কাপলদের দখলে থাকলেও এখন আমিও ভীষণ মিস করছি। কেননা প্রতি সন্ধায় প্রিয় শিক্ষক শামসুজ্জোহা এছামী স্যারের সাথে পুরো ক্যাম্পাস একসাথে হাঁটা, তাজ,মেহের, তুহিন, মেজবা, জিনান এদের সাথে আড্ডায় মেতে থাকতম ক্যাম্পাসের জোহা চত্বর,টুকিটাকি, পাশাপাশি প্রায় সন্ধায় রোকেয়া হল সহ-পশ্চিম পাড়ায় প্রতি হলের সামনে একবার হলেও পাক দেয়া হতো আড্ডার ছলে। নিজেকে খুব অসহায় মনে হয়। এখন বিকেল হলে কোন বন্ধু বা ফোন দিয়ে শহীদুল্লা কলা ভবনের সামনে রজব ভাইয়ের চায়ের দোকানে আসতে বলেনা।কোন ক্লাসমেট ফোন দিয়ে জানতে চাইনা ক্লাস কখন? ক্লাসমেট, বিতর্ক সংঘ,চিরকুমার সংঘের প্রিয় মুখগুলো আর দেখতে পাইনা। বুদ্ধিজীবির সামন বসে বন্ধু সাকি’র প্রেমতত্ত্ব, আশিকের কিপটামির চা আর সজলের বুদ্ধিদিপ্ত কথা, রজবের দোকানে খাজা হীরার গিটারের সুর, জিকরুল ও শিপনের সাথে ফুটবল নিয়ে কথা, লর্ড রতনের ও শাহাদাতের কাকা ডাক, ইয়ারমেট সানজিদাকে ভাবি বলে সম্বোধন,পুচু সাগরের ছ্যাকা দেয়ার ঐতিহাসিক গল্প, দেলোয়ারের প্রেম কাহিনী,আমানের কাল্পনিক (লতা)নামক এক রমনীকে নিয়ে মশকরা, রিজভী ও তাফসিরের হালিমা ও হিমু কে বোন বলে সবাই একটু ফাজলামি করা,মামুন,কালামকে নিয়ে বিভিন্ন হাস্যকর বাণী, মাস্টারজি আসলামের বিভিন্ন বিভাগীয় প্রেমের চ্যাটলিস্ট দেখা, বন্ধু সম্পার কাছ থেকে সাকি আর আমি জোরকরে রজবের দোকান হতে চা-খাওয়া, আরো অনেকের মধুর স্মৃতি এখন আর শোনা হয়না,মাঝরাতে প্রিয় রুমমেট রিংকুর হাতের দুধ কফি আর খাইনা, ইনামুলের প্রেমিকা না পওয়ার হতাশা, হাবিবেরটা নাই বলি, সন্ধায় চিরকুমার সভার জমপেশ আড্ডা, ইবলিশের সাজ্জাদ ভাইয়ের পিনিক ও লেবুচুর খাওয়া,রাতে হটাৎ করে জুনিয়র রাকিব,প্রিন্স,আদনান, মেজবা, তাজ, মেহের জ্ঞানী তুহিন দের সাথে কাটাখালির কালাভুনা খাওয়াটা প্রতি পরতে পরতে এগুলা সবই মিস করি। এখন আর আমার কাছে লাইব্রেরী নাই। পড়াশোনার জন্য আলাদা কোন রিডিং রুম নাই। নাই কোন পত্রিকা রুম। আর টাকা দিয়ে ইন্টারনেট কেনা তো এখন বিলাসীতা হচ্ছে । এই সময়ে মোবাইল আমার একমাত্র সঙ্গী হয়ে দাঁড়িয়েছে পাশাপাশি কিছু উপন্যাস। তারপরও চেষ্টা করছি সময়ের সঠিক ব্যবহার করার। সবার সাথে যোগাযোগ করছি। অনলাইনে বিভিন্ন এম,সি,কিউ পরীক্ষাতে অংশগ্রহণ করছি। এরপর একদিন সংবাদ দেখলাম ক্যাম্পাসের প্রবেশ পথের গাছগুলো কেটে ফেলা হয়েছে। যদিও এটা ভালোর জন্যই তবুও মনের অজান্তেই প্রচন্ড রকম খারাপ লেগেছে।ক্যাম্পাসের ভালোর কথা ভেবে মানিয়ে নিয়েছি। আবার নতুন করে এখন ঐতিহাসিক প্যারিস রোডের গাছগুলো নাকি কাঁটার পরামর্শ হচ্ছে শুনে মনে হচ্ছে কলিজাটা কেউ টুকরো টুকরো করে কেটে রোদে শুকিয়ে আগুনে পুড়িয়ে নিজে তাপ নিচ্ছে।এটা

এটা আশা করি না। করোনা পুরো পৃথিবী পাল্টে দিলেও রাবির প্রতিটি শিক্ষার্থীর ভালোবাসার জায়গা, প্রিয় মতিহার, প্রিয় ৭৫৩ একর, প্রিয় ক্যাম্পাস এর যেন কোন ক্ষতি না হয় কোন অপরুপ সৌন্দর্যের। এটাই আমার কাম্য।

ভালোবাসা, আবেগ আর অনুভূতি যেন আগের মতোই থাকে।

তাই এখন শুধু এই বিশ্বব্যাপী মহাসংকট সময়ে একটাই চাওয়া মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের কাছে, করোনার ছোবল থেকে মুক্তি পেয়ে ক্যাম্পাসে ফিরে যাওয়া এবং আমার শ্রদ্ধেয় শিক্ষক মহোদয়, বন্ধু, সহপাঠী, ক্যাম্পাসমেট, বড়ভাই, বড় আপু সবারই সুস্থতা কামনা করি যে যেখানে যেভাবেই থাকি এবং পুনরায় শহীদুল্লাহ কলাভবনের ২০৪ ও ৪০৩ নং রুমে ক্লাসে ফিরে সবার হাসিমুখটা দেখতে পারি।

লেখক – মোঃ হাসান রেজা – শিক্ষার্থী, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়

এ জাতীয় আরো খবর

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Back to top button
Close
Close